#হলদে_চিঠির_প্রেম
# পর্ব_০২
# রিয়াদ_আহম্মদ_ভূঁঞা

রাতে বাসায় ফিরে অদেখা অপরূপা সেই বাড়িওয়ালার মেয়ের নামে চিঠি লিখতে বসেছি। আরে আজব তো! আমি তো তার নামটাই জানিনা। কী লিখবো তাহলে তার নামের জায়গায়। দিয়ে দিব কিছু একটা লিখে। একের পর এক কাগজ নষ্ট করেই চলেছি। কাট ছিট করে ফেলে দেয়া কাগজে এরই মধ্যে উপচে পড়েছে টেবিলের নিচে রাখা ঝুড়িটাও। বেচারা জড়বস্তু। মুখ ফুটে কথা বলতে পারলে হয়তো আমাকে খুব করে বকে দিতো এমন অপচয়ের জন্য।

চোখে ঘুম ঘুম ভাব। না লিখেও উপায় নেই। ভোরে দরজার নিচে চিঠি না পেয়ে যদি খালি হাতে ফিরতে হয় পরে আবার কোন লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে বসবে কে জানে। অবশেষে নিজের মনের সাথে একরকম জোরজবরদস্তি করেই আবেগ অনুভূতিহীন সাদামাটা বাক্য গাঁথুনীতে লিখা শুরু করলাম;

‘হলদে পাখি,
আপনি আমার কাছে নিতান্তই একটি কৌতুহল মাত্র। আর আমি কৌতুহল বয়ে বেড়াতে পছন্দ করিনা। তাই এখানেই এর সমাপ্তি টানছি। এই হোক আমার থেকে আপনার প্রতি প্রথম ও শেষ চিঠি।

ইতি
তৃতীয় তলার ভাড়াটে’

এমন বিদ্ঘুটে, বিচ্ছিরি রকমের চিঠি পাবার পর আর কখনোই এ-মুখো হবেনা ভেবে মনটা আনন্দে নেচে উঠলো আমার। চিঠিটা ভাজ করে টেবিলে চশমার নিচে রেখে দিলাম যেনো ফজরে ভুলে না যাই। চশমা ছাড়া পথ চলতে অসুবিধে হয় আমার। এটা তো লাগবেই। যখন নিবো তখন চিঠি রেখে যাবার কথাও মনে পড়বে।

চিঠি রেখে চলে গেলাম আমি। ফিরলাম রাত সাড়ে দশটায়। দরজা খুলতেই আবারো হলদে রঙের ভাজ করা সেই কাগজ। কিছুটা বিরক্ত হলাম। কি লিখেছে তা জানতে হবে বলে হাতে তুলে নিলাম সেটা। মনে মনে নিজেকেই নিজে বলছিলাম, ‘রিয়াদ, বাসাটা না শেষ পর্যন্ত তোর ছেড়েই দিতে হয়। কিন্ত এখন তো ছাড়া যাবেনা। আবার দেড় মাসের টাকা অগ্রীম দেয়া। এই ক’টাদিন থেকেই যেতে হবে। কিন্তু থাকবি কি করে যা শুরু হয়েছে।’

একা থাকি। পাগলের মতো কতো কথাই বলি বিড়বিড় করে, মনে মনে। শুয়ে এবার চিঠির ভাজ খুলতেই আমার চক্ষু চড়কগাছ। পুরো দেড় পৃষ্ঠা জুড়ে লিখে রেখেছে। সাথে ডানে বায়ে, উপরে নিচে কি সব লতাপাতা আঁকিবুঁকি করেছে। পড়তে লাগলাম। লিখেছে;

‘এভাবে না লিখলেও পারতেন। তবে এতেই আমি খুশি। অন্তত জবাব তো পেয়েছি। বলেছেন কৌতুহলের কথা। আমাকে নিয়েই যে আপনার কৌতুহল তাই শুধু নয়, আপনাকে নিয়েও আমার অনেক কৌতুহল রয়েছে। আর সেই কৌতুহল থেকেই এর শুরু। জানেন, আমি না ছোটবেলা থেকেই খুব পারিবারিক শাসনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি। বলতে, আমার বাবা-মা আমাকে সেটুকু স্বাধীনতাই দিয়েছেন যখন যেটুকু স্বাধীনতা আমার জন্য মঙ্গলজনক ছিলো, তাঁরা ভেবেছেন। ঘরে কাউকে না জানিয়ে একা গেটের বাইরে যাওয়ার উপর ছিলো কঠোর নিষেধাজ্ঞা। একদিন বাসার সামনে হাওয়াই মিঠাই আসলো। ছাদ থেকে সেটা দেখলাম আমি। রাস্তা নিরব থাকায় লোকটি দাড়াচ্ছিলো না কোথাও। আমারো খুব লোভ হলো হাওয়াই মিঠাই খাবো। তাই তড়িঘড়ি করে ছাদ থেকে নেমে নিজের কক্ষে যাই আর সেখানে বইয়ের ভেতরে রাখা ক’দিন আগে মামার দিয়ে যাওয়া বিশ টাকার একটি কড়কড়ে নোট নিয়ে দৌড়ে রাস্তায় চলে যাই। মা রান্নাঘরে ছিলেন। বাবা বাসায় ছিলেন না। আমার বাকি দুবোন খেলায় মগ্ন ছিলো। ছোটভাইটার জন্ম হয়নি তখনো। এরপর এই-যে লোকটাকে পিছন থেকে ডাকতে লাগলাম তার আর থামার কোন লক্ষণ নেই। সে যেনো আরো দ্রুত পায়ে এগুচ্ছিলো। আমিও নাছোড়বান্দা। হাওয়াই মিঠাই খাবোই খাবো। দৌড়াতেই লাগলাম। একটা সময় পরে আমি পেছনে আসতে পারছিলাম না আর। রাস্তা ভুলে গেলাম। ততক্ষণে লোকটা আরো দূরে চলে গেলো। এ যেনো আমি অন্ধকারে আলেয়ার পেছনে ছুটছি। আমি থমকে দাঁড়ালাম। কান্না শুরু করলাম। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। আল্লাহর সহায় ঠিক তখনি বাবা এসে আমার সামনে হাজির! তাঁর এক হাতে বাজারের ব্যাগ অন্য হাতে ছিলো আমাদের জন্য মুখরোচক সব খাবার। সেদিনের পর থেকে আর কখনোই আমি গেটের বাইরে একা যাইনি যতদিন না সবকিছু বুঝতে শিখেছি, পথেঘাটে চলতে শিখেছি। দেখুন না, কি সব আজগুবি কথা শুরু করে দিলাম। আসলে, মনের মধ্যে অনেক কথা জমে আছে জানেন তো। কিন্তু বলার মতো কেউ-ই নেই। আপনি যেনো কিছু মনে করবেন না আবার। এর উত্তর পেলে আবারো লিখবো। আর যেমনটি বলছিলেন – আগের চিঠিটাই যদি আপনার শেষ চিঠি হয়ে থাকে তাহলে আর লিখবোনা আমি।

ইতি
হলদে পাখি’

চিঠিটা হৃদয়ে দাগ কেটে গেলো আমার। দাগ কাটলো উনার অতি গুছানো সুন্দর লিখাগুলো। দাগ কাটলো চারপাশে এতো সুন্দর করে ফুল, লতাপাতা এঁকে দেয়াটা। কতোটা সময় নিয়ে এটি লিখতে হয়েছে, আঁকতে হয়েছে, মনের ভেতর সেই প্রশ্নগুলো জাগলো। বিস্মিত হলাম কিছুক্ষণ আগেই যা নিতান্তই আঁকিবুঁকি হিসেবে দেখছিলাম এখন তা আমার কাছে একটা শিল্পের মতো মনে হচ্ছে। কাগজে, কাপড়ে, পিঠায় আঁকিবুঁকি করাটাও একটা দুর্দান্ত শিল্প যা বাঙালি নারীদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় অনিন্দ্য প্রানবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে।

এই শিল্প আর বিশ টাকার নোটের বিষয়ে দুটি কথা না বললেই নয়। আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম নিজস্ব কাগুজে মূদ্রা চালু হয় উনিশশো বাহাত্তর খ্রিস্টাব্দের চার-ই মার্চ। সেটি ছিলো একটি এক টাকার নোট যাতে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত ছিল। যেদিন এ নোট দেশের বাজারে ছাড়া হয় সেদিনই বাংলাদেশি কারেন্সিকে টাকা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। ঐ নোটটি ছাপা হয় ইন্ডিয়ান সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে। এবং এর দ্বিতীয় সিরিজে নোট মুদ্রণ করা হয় যুক্তরাজ্য থেকে। এবং এতে ডিজাইন অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্যদের একজন ছিলেন আমাদেরই বৃহত্তর ময়মনসিংহের কৃতিসন্তান শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। অন্যান্যরা ছিলেন, পটুয়া কামরুল হাসান, কে জি মুস্তফা, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ও শিক্ষাবিদ নীলিমা ইব্রাহিম। আর বিশ টাকার নোট প্রথম বাজারে আসে উনিশশো উনআশি খ্রিস্টাব্দের বিশ -এ আগস্ট।

এবার আমি নিজেকে অপরাধী ভাবতে লাগলাম ঐ ধরনের বিদ্ঘুটে আড়াই লাইনের একটি চিঠি লিখার জন্য। কিন্তু আমার চোখে ততক্ষণে রাজ্যের ঘুম এসে হাজির। এখুনি না ঘুমালে বিদ্রোহ শুরু হয়ে যাবে। পরিণামে আমাকে ভুগতে হবে মাইগ্রেনের ব্যথায়। যতগুলো কারণে মাইগ্রেন হয় তার অন্যতম একটি কারণ হলো পরিমিত ঘুম না হওয়া। তাই চটজলদি এক টুকরো কাগজ নিয়ে তাতে লিখলাম;

‘হলদে পাখি,
কথাগুলোকে খাঁচায় বন্দী রাখবেন না আর। মুক্তি দিন। উড়তে পারার জন্য তৃতীয় তলায় বিশাল এক গগন রয়েছে, যা সীমাহীন।

ইতি
হলদে চিঠির প্রাপক’

জানি চিঠিটা পড়ার পর প্রচন্ডরকম হাসবেন উনি। হলও তাই। পরদিন বৃহস্পতিবার ছিলো। পরের চিঠিতে তার বর্ণনাও পেলাম। লিখেছে;

‘আজকের দিনটি দারুণভাবে শুরু হয়েছিলো আমার। চিঠি পড়ে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গিয়েছিল একদম। তথাপি বার-বার পড়ছিলাম। কি লিখেছিলেন আপনি? ও হ্যা, “কথাগুলোকে খাঁচায় বন্দী রাখবেন না আর। মুক্তি দিন। উড়তে পারার জন্য তৃতীয় তলায় বিশাল এক গগন রয়েছে, যা সীমাহীন।” সবকিছুই ঠিক ছিলো তবে, সবচেয়ে মজার ছিলো, ‘তৃতীয় তলায় বিশাল এক গগন রয়েছে, যা সীমাহীন’ কথাটি। বেশ সুন্দরভাবে কথা বলেন তো আপনি। যাক, আমার কথাগুলো এবার সেই সীমাহীন আকাশে মুক্ত মনে উড়তে পারবে তাহলে। আচ্ছা একটা অনুরোধ করবো রাখবেন কিন্তু। অবশ্য, যতক্ষণে আপনি আমার চিঠিটা পড়বেন ততক্ষণে মোটামুটি সব আয়োজন শেষ হয়ে যাবে। তবুও বলছি। আপনার প্রিয় খাবারের মধ্যে কি কি আছে, বিশেষ করে ভাতের সাথে কি কি খেতে অধিক পছন্দ করেন জানতে পারি কি? আমি অপেক্ষায় থাকবো। জানাতে ভুলবেন না যেনো।

ইতি
হলদে পাখি’

আসলেই, যখন আমি চিঠিটা পড়ছিলাম তখন রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। কাল জুমা’র পরেই উনাদের বাসায় দাওয়াত। এখন অযথাই নিজের পছন্দের খাবার তালিকা জানিয়ে লিখলে সেটা হবে একধরনের অবিচার। তার উপর সাদিক সাহেবের স্ত্রী অসুস্থ। উনি সুস্থ থাকলেও না একটা কথা ছিলো। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে লিখলাম,

‘হলদে পাখি,
আমি জানিনা কি লিখি আর তা কেমন হয়। তবে আমি মন থেকে যা আসে তাই লিখি। আপনার ভালো লেগেছে সেটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। আর যদি গভীরের কথা বলি তা হলো হঠাৎ করেই চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে জমে থাকা ভাবগুলোর বিনিময়ই মূলত আপনাকে উল্লসিত করে তুলেছে। আনন্দ দিচ্ছে। হয়তো প্রকৃত ভালোলাগার কারণ সেটাই, আমার লিখার ধরন নয়। আর হ্যা, আমার প্রিয় খাবার তালিকায় উল্লেখযোগ্য তেমনকিছুই নেই। উদ্ধিগ্ন হবেন না।

ইতি
সীমাহীন গগন’

পরদিন বাইরে কোথাও গেলামনা আর। গোসল করলাম বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে। তারপর বেলকনিতে বসে পাণ্ডুলিপিটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম। তখনি মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসলো। বাজার থেকে লুকিয়ে কিনে এনে রাখা হুঁকো টা বের করলাম। না, নেশা করার মতলবে নয়। অনেককেই দেখি এটা টানেন। কৃষক থেকে শুরু করে এমনকি কতেক কবি সাহিত্যিকরাও! চুরুট বিড়ির চেয়ে নাকি এতে নেশা হয় বেশি। আমি তো নেশা করিনা। তো আনলাম কেন। কারণ, আমার বহুদিনের শখ বেলকনিতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসবো আমি। তারপর সামনের টেবিলের উপর রাখবো লিখালিখির সরঞ্জামাদি। তার পাশে পাণ্ডুলিপি। এরপর খালি হুঁকোয় পানি ভরে মনের সুখে টানবো আর বুদ্বুদ শব্দে চারাপাশে একটা সাহিত্য সাহিত্য আবহ তৈরি হবে। তখন মাঝে মাঝে আঁড়চোখে পাণ্ডুলিপির দিকে তাকাবো আর সামনে কল্পনায় শিষ্যের বেশে নিজেকে কাচুমাচু হয়ে বসে থাকতে দেখে গম্ভীর স্বরে গুরুর মতো বলবো, ‘বাছা, লিখালিখি যেনতেন কোন বিষয় নহে। ইহা এক মহা তপস্যার বিষয়। তপস্যা করো!’

যেই ভাবা সেই কাজ। খাটের নিচে রাখা হুঁকোর ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেলকনির দিকে পা বাড়ালাম। এমন সময় কেউ কলিংবেল চাপলো। বেখেয়ালি মন সেটা হাত থেকে রাখতে ভুলে গেলো। তা নিয়েই দরজা খুলে দিলাম। সাদিক সাহেব! উনার কোমরে গামছা বাঁধা। হাতে পায়ে ধুলোবালির ছাপ। এবার নিজের হাতটা পেছনের দিকে নিয়ে উনাকে সালাম দিলাম। জবাব দিলেন উনি। তারপর বললেন,

– নামাজে যাবেনা?
– জ্বী, যাব।
– হাতে ওটা কি?
– তেমন কিছুনা। ময়লা।
– ওহ আচ্ছা। দাও আমি ফেলে দিই।
– না থাক। আমিই ফেলে দিতে পারবো।
– আরে দাও তো। আমি সবেমাত্র ঘরের সব ময়লা পরিষ্কার করলাম। মেয়েটা একা সব করলে হাঁপিয়ে যেতো। ঐ মহিলাও আজ আসেনি। দাও, বাইরে ডাস্টবিনে ফেলে দিবনে।

আর কিছু না বলে দিয়ে দিলাম উনার কাছে। তিনি অদূরেই সিঁড়িতে থাকা ময়লা ভর্তি পাটের বস্তায় সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। আমি যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। উফ!

চলে গেলেন উনি। হুঁকা নিয়ে একটি কথা না বললেই নয়। বাংলা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষায় হুঁকা শব্দটি প্রচলিত আছে। এটি একটি ধুমপানের যন্ত্র বিশেষ। মুগল যুগে এদেশে ব্যবসারত ইংরেজ ও অন্যান্যরা একে হাবল-বাবল বলেও সম্বোধন করতো। এখন এর দেখা তেমন মেলেনা। এরপরও তথাকথিত মাজারের ওরস, স্বঘোষিত ভবঘুরে সন্যাসী-ফকিরদের আসরে এর দেখা মেলে। তবে হ্যা, ধূমপান সেটা যেই করুক আর যে যন্ত্রের দ্বারাই করুক না কেন ধূমপায়ীর ক্ষতি অনিবার্য। এ থেকে সকলেরই বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়।

ততক্ষণে আজান হয়ে গেছে। আমি অপেক্ষা করছিলাম সাদিক সাহেবের জন্য। ভাবছিলাম তিনি হয়তো আমাকে ডেকে নিয়ে বেরুবেন। না তিনি আসলেন না। হয়তো ব্যস্ত আছেন। অপেক্ষা না করে এবার বেরিয়ে পড়লাম। শয়ে শয়ে মানুষ মসজিদে যাচ্ছে। কারোর হাতে পিতলের জগ তো কারোর হাতে কলসী। কেউ বা কাঁচের বোতল নিয়ে যাচ্ছেন। এসবের ভেতরে পানি। এগুলো মসজিদের সামনে সারি বেঁধে রেখে দেয়া হয়। নামাজের পর মুসল্লীরা তাতে ফুঁ দিয়ে যান। এই পানিকে পড়া পানি ও উতার পানিও বলতে শোনা যায়।

নামাজের পর শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলো। মসজিদে বসেও কয়েকবার হেলে পড়েছিলাম ঝিঁমুতে ঝিঁমুতে। বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টেরও পাইনি। কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো। সাদিক সাহেব নিশ্চয়। হ্যা তিনিই। আমাকে ডাকতে এসেছিলেন।

হাতমুখ ধুয়ে নিলাম। চোখমুখ ফুলে গেছে কিছুটা। পাঞ্জাবি পরে চুলগুলো আঁচড়ে আয়নার সামনে নিজেকেই নিজে ঘুরেফিরে দেখে নিলাম কেমন লাগছে। হাজার হোক দাওয়াত খেতে যাচ্ছি বলে কথা। দরজার সামনে গিয়ে কলিংবেল চাপার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দরজা খুলে দেয়া হলো। একি! একে তো কখনো দেখিনি। আট-দশ বছর বয়সী একটি ছেলে। চেহারাটা মাশাআল্লাহ বেশ মায়াবি। তাকেও সালাম দিলাম,

– আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়ালাইকুমুসসালাম। আপনিই সে?
– কার কথা বলছো বলতো!
– বাবা বললেন মেহমানের কথা।
– হ্যা, আমিই সে। চলো ভেতরে।

সাদিক সাহেবের বাকি ছেলেমেয়েরা গ্রাম থেকে চলে এসেছে তাহলে। বললাম,
– তোমার নাম কি?
– তায়েফ আহমেদ।
– বাহ্! বেশ সুন্দর নাম তো। কে রেখেছে তোমার নাম?
– আমার বড় আপু।
– ওহ আচ্ছা।

এমন সময় কেউ ভেতর থেকে ওকে ডাকলো। চলে গেলো ও। আমি সোফায় বসে রইলাম। খেয়াল করলাম পেইন্টিংগুলোর অবস্থান বদলে দেয়া হয়েছে। আরো নানান জিনিস নড়চড় করা হয়েছে। সাজানো হয়েছে নতুন মাত্রায়। পরিপাটি সবকিছু গোছানো ও পরিষ্কার। এমনটি সচরাচর দেখা যায়না। সবাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন না। কিন্তু এভাবেই সবসময় থাকা দরকার। কিছুক্ষণ পর সাদিক সাহেব আসলেন। সাথে তায়েফও। ও ওর বাঁ হাত দিয়ে সাদিক সাহেবের ডান হাতের তর্জুনি আঙ্গুলটি মুষ্টি করে ধরে রেখেছে। সাদিক সাহেব ওকে নিয়ে এসে সোফায় বসতে বসতে বললেন,

– ওরা গতকাল রওয়ানা হয়েছিলো। নামাজের আগে আগেই এসেছে। পথে ছিলো এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে।

বললাম,
– কেউ নিয়ে আসেনি?
– হ্যা, আমার ছোটভাই এসেছে। একটা কাজে গেছে ও। রাতে আসলে পরিচয় করিয়ে দিবনে।

কেন যেনো মনে হচ্ছিলো কেউ আড়াল থেকে দেখছে আমায়। যেখানে বসেছি তার ঠিক বরাবর পেছনের দিকে একটি কক্ষ আছে। সেদিকে তাকাতে যাব অমনি তায়েফ ওর বাবার আঙ্গুল ছেড়ে বলে উঠলো, ‘আপু, দেখে ফেলেছি তোমাকে। দেখে ফেলেছি।’ এই বলতে বলতে কক্ষের দিকে দৌড়ে চলে গেলো ও। আমি এবার সাদিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে অনেকটা জোর করেই মুচকি হাসার চেষ্টা করলাম। উনিও হাসলেন। এমন ভাব করলাম যেনো কিছুই হয়নি। অথচ, ভেতরে ভেতরে কৌতুহলের অন্ত নেই। ভাবছি, কে ছিলো এটা। তায়েফের বড় বোন? ঐ হলদে পাখি! নাকি অন্য কেউ।

——-চলবে——-

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here