চোখের সম্মুখে ভালোবাসার মানুষটার বিয়ে হতে দেখা যেনতেন ব্যাপার নয়। এর অভিজ্ঞতা অত্যন্ত বাজে। এই বাজে অভিজ্ঞতাটা ইরন চার বছর পূর্বে লাভ করেছিল। সে বড়ো কঠিন এক মুহূর্ত ছিল তার জন্য। এক রত্তি যে শান্তি মতো চোখের অশ্রু বিসর্জন দেবে সে উপায়টুকুও তার ছিল না। বিয়ে উপলক্ষ্যে বাড়িতে এত অতিথিদের ঢল শুরু হয়েছিল যে, নিভৃতে কাঁদাই দায় হয়ে পড়লো তার জন্য। তবে কেঁদেছিল। যখন বিয়ের কাজ শেষ হওয়ার পর সব আমেজ কমে পরিবেশ ঝিমিয়ে পড়লো, তখন সে কাঁদার সুযোগ পেয়েছিল। সে সুযোগও ছিল অতি অল্প। ঘটনাটা মনে পড়তেই ইরনের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। মা’র কী দরকার ছিল তার শান্তিপূর্ণ অশ্রু বিসর্জনের সময় বিরক্ত করার?
দোতলায় নিজের শয়ন কক্ষের জানালা দিয়ে ইরন এখন লনে তাকিয়ে আছে। দেখা যাচ্ছে সকালের কাঁচা সোনার মতো রোদ গায়ে জড়িয়ে লনের চেয়ারে বসে রয়েছে জাবিদ আর নয়না। ওদের থেকে একটু দূরে দুই বছর বয়সি ঈশানকে নিয়ে খেলা করছে মিনার। ঈশানের আনন্দময় হাসির শব্দ দোতলায় বসেও শুনতে পাচ্ছে ইরন। মিনারের বাচ্চা নিয়ে খেলাধুলার দৃশ্যটা অত প্রভাবিত করছে না ইরনের দৃষ্টিকে, যতটা প্রভাবিত করছে জাবিদ আর নয়নার এক সাথে চায়ের কাপে চুমুকের দৃশ্যটা। জাবিদ হলো সেই মানুষ যাকে ইরন পাঁচ বছর ধরে ভালোবেসেছে। গোপন ভালোবাসা এটা। একেবারে গোপন বলাও ঠিক নয়। তিনজন জানতো এই ঘটনা সম্পর্কে। তবে জাবিদ জানতো না। জাবিদকে কখনও বলেনি। আর বলতে হবে কেন? জাবিদের তো এমনিতেই টের পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কী বলুন তো, জাবিদ এত গম্ভীর একটা মানুষ যে তাকে গুঁতো দিয়ে কোনো কিছু টের না পাইয়ে দিলে সে টের পায় না। আজব মানুষ! তবুও এই আজব মানুষটাকে ইরন ভালোবেসেছিল। এখন বাসে না। চেষ্টা করে ভাই-বোনের সম্পর্ক মেনে চলতে। কিন্তু তাও মাঝে মাঝে অস্বস্তি হয়।
আমিনা বেগম মেয়ের কক্ষে প্রবেশ করে দেখলেন তার মেয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ওর পরনে এখনও শর্ট টপস আর প্যান্ট। আমিনা বিরক্ত গলায় শুধালেন,
“এখনও তৈরি হওনি?” প্রথম কথাটা বলার সাথে সাথে ইরন তার দিকে তাকালো। “জলদি তৈরি হয়ে নাও, ওরা তো এসে পড়বে।”
বলে আর দাঁড়ালেন না আমিনা। চলে গেলেন। ইরন আবারও বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। মনে মনে নিজেকে বোঝালো,
‘অতীত নিয়ে চিন্তা করা অর্থহীন। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্বপ্ন গড়াই অর্থবোধক এবং মূল্যবান।’
________________
বাড়ির নাম ‘মেঘডম্বর’। তিন ভাই- শেখ রুস্তম, শেখ আলী ও শেখ উসমান নিজেদের মাঝে অটুট বন্ধন দৃঢ় রাখতে পৃথক বসবাসের চিন্তা না করে এক বাড়িতেই থাকছে পরিবার নিয়ে। পরিবারের সকলের সাথেই সকলের গভীর সম্পর্ক।
বড়ো ভাই শেখ রুস্তমের দুই কন্যা। ছোটো কন্যা ইরন, আর বড়ো কন্যা ইরাবতী। ইরাবতীর বিয়ে হয়েছে। সে শ্বশুর বাড়িতে থাকে। আজকে তার বাবার বাড়ি আসার কথা। কারণ, ছোটো বোন ইরনকে আজ পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে।
মেজো ভাই শেখ আলীর দুজন পুত্র। বড়ো পুত্র জাবিদ। জাবিদ পেশায় একজন ডাক্তার। ছোটো পুত্র বায়েজিদ। সে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ অবস্থান করছে, অস্ট্রেলিয়ায়।
ছোটো ভাই উসমানের এক পুত্র। তার নাম মিনার।
মিনার আর ইরন বয়সে মাত্র চার দিনের বড়ো-ছোটো। দুজন পিঠাপিঠি বয়সের হওয়ায় ছোটো বেলা থেকেই দুজনের সর্বদা একসঙ্গে থাকা হয়েছে।
________________
পাত্রের নাম সজল মাহমুদ। দেখতে সুদর্শন, লম্বা এবং সুঠাম দেহের অধিকারী। সেও পেশায় একজন ডাক্তার। ইরনের ধারণা লোকটা স্বামী হিসেবে খারাপ হবে না। তবে তার ধারণার ধার ঘেঁষে কে? পরিবার যদি বলে একে তোমার বিয়ে করতে হবে, তাহলে একেই করতে হবে। পরিবার যদি বলে ওকে তোমার বিয়ে করতে হবে, তাহলে ওকেই করতে হবে।
পাত্র-পাত্রীকে আলাদাভাবে কথোপকথনের সুযোগ দেওয়া হলো। এমন একটা মুহূর্তে সব মেয়েদেরই একটু-আধটু হলেও লজ্জাবোধ হয় বা করা উচিত, কিন্তু ইরনের লজ্জা লাগছে না।
‘এত নির্লজ্জ কবে হলাম আমি?’ নিজের উদ্দেশ্যে নিজে প্রশ্ন করে উঠলো ইরন। মনে মনে। এমন প্রশ্ন কি আর পাত্রের সামনে উচ্চ বাচ্যে করা যায়?
বাড়ির পিছনে কিছুটা খোলা জায়গা আছে। জায়গাটা ছায়া ঘেরা। সেখানে দুটো টেবিল ঘিরে পৃথকভাবে চারটা চারটা করে মোট আটটা চেয়ার রাখা আছে। ইরন আর সজল একটা টেবিল ঘিরে বিপ্রতীপ হয়ে বসলো। লজ্জা বোধ না হলেও একটা অস্বস্তিবোধ কাঁটার মতো খোঁচাচ্ছে ইরনকে। যেটা এতক্ষণ টের পায়নি। কিন্তু মানুষটার মুখোমুখি বসতেই টের পেল।
“তোমাকে ছবিতে যতটা সুন্দর দেখেছিলাম তুমি বাস্তবে আসলে ততটা সুন্দর নও!”
সম্মুখের ব্যক্তিটার থেকে এমন একটা কথা আসায় অপমানে থরথর করে উঠলো ইরনের অন্তঃপুর। অপমানের সূক্ষ্ম রেখা তিরতির করে চি’রে দিয়ে গেল তার হৃৎপৃষ্ঠ। কখন যে সে রেগে গেল টেরই পেল না। বলে উঠলো,
“ছবিতে যতটা সুন্দর দেখেছেন এখন আমি ততটা সুন্দর না হওয়ায় যদি আপনার আমাকে বিয়ে করতে আপত্তি থাকে, তাহলে আপনি যেতে পারেন। এতে না আমার আপত্তি আছে, আর না আমার পরিবারের।”
সজল হেসে বললো,
“আরে তুমি তো দেখছি রেগে গেছো।”
“স্যরি! আমি এমনই। হুটহাট রেগে যাওয়া আমার অভ্যাস, আমার স্বভাব।”
“কিন্তু আমি তোমার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।”
“তাহলে তো আপনার এখনই চলে যাওয়া উচিত।”
“আমার মনে হয় থাকা উচিত। আর এটাও মনে হয় যে, দুটো মানুষ যদি দুরকম হয়, তাদের মাঝেও অন্যরকম একটা মিল থাকে। হয়তো আমাদের মাঝেও ওই মিলটা খুঁজে পাওয়া যাবে।”
না, লোকটাকে যেমন ভেবেছিল লোকটা আসলে তেমন নয়। সৌন্দর্যের মাঝেও অসৌন্দর্য লুকিয়ে আছে লোকটার মাঝে। এমন একটা লোককে বিয়ে করা সম্ভব নয়। মানুষটাকে যেরকম আবিষ্কার করছে তাতে ইচ্ছা করছে এখান থেকে উঠে চলে যায়, আর বিয়েতে না করে দেয়।
সজল ইরনের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
“কী ভাবছো?” অন্যমনস্ক ইরন সচকিত হয়ে তাকালো।
“চলে যাওয়ার কথা ভাবছো? আমার সাথে বিয়েতে না করে দেবে এমনটা ভাবছো না কি?”
ইরন চমকে গেল। এই লোক কি মন পড়তে পারে? বুঝলো কী করে যে ও এই কথাই ভাবছে? লোকটা ঠিক কীসের ডাক্তার? মনস্তাত্ত্বিক রোগের ডাক্তার না কি? প্রশ্নটা বোকার মতো করেই ফেললো ইরন,
“আপনি কীসের ডাক্তার?”
সজল হেসে বললো,
“ভূতের ডাক্তার। ভূত-পেতনিরা অসুস্থ হলে আমি তাদের চিকিৎসা দিয়ে ভালো করে তুলি।”
এরপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“তোমার এই বিয়েতে না করতে হবে না। আমিই না করে দেবো। কারণ, তোমাকেও আমার পছন্দ হয়নি।”
সজল ভিতরে চলে গেল।
ইরন তার যাওয়ার পথে তাকিয়ে থেকে বললো,
“বিরক্তিকর লোক!”
হতাশাজনক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো ইরন। তাকে দেখতে আসা প্রথম পাত্র ছিল এটা। প্রথম পাত্রটারই কেন এমন হতে হলো? তার পরিবার কোত্থেকে এই পাত্রের সন্ধান পেয়েছিল? তবে একটা ব্যাপার ভালো যে বিয়ের আগেই ছেলেটা তার মনের অসৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। চাইলে তো কেবল সৌন্দর্যের মুখোশ পরেও থাকতে পারতো। আর ছেলেটা বিয়েতে না করে দেবে এতে ইরনের সুবিধাই হবে। বিয়ে করবে না এটা পরিবারকে বলা ইরনের পক্ষে সহজ কোনো ব্যাপার নয়। কঠিন! অতি কঠিন!
আকস্মিক মিনারের রুমের জানালায় চোখ পড়লো ইরনের। মনে হলো কেউ একজন সে তাকানো মাত্রই পর্দার ওপাশে চলে গেছে। কে ছিল ওটা? মিনার?
_______________
মিনারের মন খারাপ। অত্যন্ত খারাপ! যে সময়টা থেকে ইরনের বিয়ে নিয়ে কথা উঠেছে বাড়িতে, সেই থেকে মুষড়ে পড়েছে তার ভিতরটা। মিনার জানে এর কারণ কী। কিন্তু জেনেও কিছু করার নেই তার। এটা একটা সাধারণ ব্যাপার যে দুটো ছেলে-মেয়ে একসাথে বড়ো হলে, একসাথে থাকলে, তাদের হৃদয়ে একে অপরের জন্য ভিন্ন এক অনুভূতি জন্ম নিতে পারে। এটা সাধারণ একটা ঘটনা। আর এই সাধারণ ঘটনাটাই বড়ো কঠিনভাবে জন্ম নিয়েছে মিনারের হৃদয়ে। অনেক আগে থেকে এটা তার হৃদয়ে লালিত হচ্ছে। প্রথম যখন এই অনুভূতি টের পেয়েছিল তখন মিনারের বয়স তেরো। সেই তেরো বছর বয়স থেকে অনুভূতি একটু একটু করে গাঢ় হতে শুরু করে এখন সম্পূর্ণ রূপে গাঢ় রং ধারণ করেছে। ইরনের অবশ্য কস্মিনকালেও এই অনুভূতিটা তার প্রতি আসেনি। তবে এটা ভেবে মিনারের যে খুব খারাপ লাগে তা নয়। অনুভূতি জন্ম নেওয়া, বিলুপ্ত হওয়া সব প্রাকৃতিক ব্যাপার, যার যার মনের ব্যাপার।
মিনার ভীতু একটা ছেলে! কখনও ইরনকে বলতে পারেনি নিজের অনুভূতি সম্পর্কে। অনেকবার চেষ্টা করেছে বলবে, কিন্তু পারেনি। ভয়, লজ্জা, চিন্তা সবকিছু তাকে আটকে ধরেছে, সামনে এগোতে দেয়নি এক কদমও। সময় যেতে যেতে এখন ইরনের বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে! অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে মিনারের হৃদয়ে। কেঁদেছেও, এখনও চোখ বেয়ে হঠাৎ হঠাৎ জল নামছে।
মিনারের মনে পড়ে, যখন ক্লাস টেনে পড়ে তখন ইরনকে একটা চিঠি লিখেছিল সে। না, হাতে লেখা চিঠি নয়, প্রিন্ট করা চিঠি দিয়েছিল। প্রিন্টের দোকানে মিথ্যা বলে সে চিঠিটা ছেপেছিল। বলেছিল এক বড়ো ভাই তাকে কাজটা করতে বলেছে।
প্রিন্ট করা চিঠি দেওয়ার কারণ হচ্ছে ইরন তার হাতের লেখা দেখা মাত্রই চিনে ফেলতো। তাই প্রিন্টের আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সে দেখতে চাইছিল ইরনের কী অনুভূতি হয় চিঠিটা পড়ে।
চিঠিতে কী লিখেছিল মিনারের আজও স্পষ্ট মনে আছে। মনে তো থাকারই কথা, কাউকে লেখা প্রথম চিঠি, আর এ যাবৎ লেখা শেষ চিঠিও ওটাই। চিঠিতে লেখা ছিল,
‘প্রিয় ইরন,
আমি ভীষণ ভীতু একটা ছেলে! আর এই ভীতু ছেলেটার হৃদয়ে হঠাৎ কিছু অদ্ভুত অনুভূতির চারা গজিয়েছে। চারাগুলো ভালোবাসার। আর চারাগুলো গজানোর কারণ তুমি। একান্ত তুমি! ভালোবাসি!
ইতি-
…’
নামের স্থানটা শূন্য রেখেছিল। নিজের নামটা কী করে লিখতো ওখানে? অতটা সাহস, উদ্যম তার বুকে ছিল না। এখনও নেই। চিঠিটা সে খুব যত্ন করে ইরনের রসায়ন বইয়ের ভিতর রেখে দিয়েছিল। ভেবেছিল ইরন চিঠিটা পড়ে বড়ো জোর ওটা ছিড়ে ফেলে দেবে। কিন্তু না, তার ধারণা ভুল ছিল। ইরন চিঠিটা নিয়ে তার মাকেই দেখিয়েছিল প্রথমে।
মিনারের মায়ের সাথেই ইরন বেশি সময় কাটায়। মিনারের মাকে যখন চিঠিটা দেখিয়েছিল তখন মিনারও সেখানে উপস্থিত ছিল। ওই সময়টায় তার এত লজ্জা আর ভয় করছিল তা বলার মতো নয়। ছেলের হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে লেখা চিঠি মা পড়ছে? ইচ্ছা হচ্ছিল লজ্জায় মাটি ফুঁড়ে তার ভিতর ঢুকে যায়।
আস্তে আস্তে বাড়ির সবাই জানলো চিঠির ব্যাপারটা সম্পর্কে। মিনার কেবল দোয়া দরুদ পড়ছিল। যদি কোনো রকম প্রকাশ হয় এই কাজটা সে করেছে, তাহলে বাবা নিশ্চয়ই তাকে বাঁচতে দেবে না।
সন্ধ্যার পরে যখন বাসার সবাই একসাথে নাস্তা করতে বসলো তখন ইরনকে জিজ্ঞেস করা হলো, চিঠিটা তার স্কুলের কেউ দিয়েছে কি না। ইরন বললো,
“মনে হয় না স্কুলের কেউ দিয়েছে।”
বড়ো চাচা মিনারকে উশখুশ করতে দেখে বললেন,
“তুমি কিছু জানো?”
মিনার হয়তো আর একটু হলেই হার্ট অ্যাটাক করতো। এই সবে তার উপর নজর পড়েছে। এখন কোথা থেকে কী কী প্রশ্ন করতে পারে তার কোনো ধারণা নেই। এখন মিথ্যা একটা কিছু না বললেই নয়। বাঁচতে হবে তাকে। মিনার কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,
“জা… জানি।”
সবার চক্ষু স্ফীত হয়ে উঠলো।
“জানো?”
“হ্যাঁ, এ…এটা শা…শামীম ভাই দিয়েছে!”
মিথ্যা বলার সময় কণ্ঠ তো কাঁপছিলই, মিনার নিজেও কাঁপছিল। শামীম ছিল এ বাড়ির ড্রাইভার। ভয়, লজ্জায় শেষমেশ ড্রাইভারকে ফাঁসিয়ে দিয়েছিল!
মিনারের কথা শুনে মেজো চাচি বললেন,
“হ্যাঁ আমারও শামীমকে সন্দেহ। আমি প্রায়ই লক্ষ করেছি শামীম ইরনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা ওরই কাজ।”
বেশ, এরপর শামীমকে গিয়ে ধরা হলো। শামীম জোর গলায় বললো, সে কাজটা করেনি। কিন্তু কেউ সে কথা বিশ্বাস করলো না। শামীমকে মারধর করে এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো! আর সেদিনই শেখ রুস্তম বাড়িতে একটা ঘোষণা দিলেন, এ বাড়ির কোনো ছেলে-মেয়ে কখনও প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কে জড়াতে পারবে না কারো সাথে। তাহলে খুব খারাপ হবে। পরিবার যার সাথে বিয়ে ঠিক করবে তার সাথেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে। সুতরাং এ কথা মাথায় রেখে যেন প্রত্যেকটা ছেলে-মেয়ে চলে।
ওই ঘোষণার পর যেন মিনার আরও ভীতু হয়ে গেছে। কিন্তু কথাটা এতকাল ধরে বুকে আটকে রাখতে রাখতে হৃদয়টা ব্যথা করছে। কথাগুলো প্রকাশ না হলে এই ব্যথা কমবে না। হয়তো ক্যান্সার তৈরি হবে হৃদয়ে! আর ওই ক্যান্সারেই একদিন মারা যাবে সে! মিনার বালিশটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো বুকের মাঝে। সে চায় না তার কান্নার কোনো শব্দ হোক। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ ফুলে লাল হয়ে গেছে।
এমনভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না তার। সে তো জানতো ইরনের বিয়ে হলে অন্য কারো সাথেই হবে, তার সাথে কখনও হবে না! এখন তো যেটা হওয়ার সেটাই হচ্ছে! তাহলে এখন কেন সে এটা মানতে পারছে না? কেন কাঁদছে? কেন তার হৃদয়ে এত ব্যথা? চাপা কান্নার আওয়াজটা চেপে রাখতে চেয়েও লাভ হচ্ছে না। ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে আওয়াজটা।
_________________
বিয়ে ঠিকঠাক। আগামী শুক্রবার বিয়ে। আর মাত্র দুই দিন পর। ইরন বুঝতে পারছে না কোত্থেকে কী হলো। লোকটা তো বলে গেল সে এই বিয়েতে না করে দেবে। তাহলে এখন এসব কী হচ্ছে? নিজের রুমে বসে ইরন বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করছিল। এমন সময়ে কল এলো অপরিচিত নাম্বার থেকে।
ওপাশ থেকে একটা পুরুষালি কণ্ঠ সালাম দিলো,
“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়াআলাইকুমুস সালাম। কে?”
“যার সাথে শুক্রবার তোমার বিয়ে হবে। আমি সজল।”
“আপনি? আপনি না বলে গেলেন আপনি এই বিয়েতে না করে দেবেন? তাহলে এখন এসব কী হচ্ছে?”
“এটাই তো হওয়ার ছিল।”
“না এমনটা তো কথা ছিল না। আপনি…”
“আমি মজা করেছিলাম।” ইরনকে আর কিছু বলতে দিলো না সজল, “আমি বলেছিলাম তোমাকে ছবিতে যতটা সুন্দর দেখেছিলাম তুমি বাস্তবে আসলে ততটা সুন্দর নও। মিথ্যা ছিল ওটা। কারণ, আমি কখনও তোমার ছবি দেখিইনি। আমি সরাসরি আজকেই প্রথম দেখেছি তোমাকে। আর আমার দেখে পছন্দ হয়েছে। তাই আমি হ্যাঁ বলেছি। বিয়েটা হয়ে যাক, তারপর তুমিও পছন্দ করবে আমায়।”
কথাগুলো শুনে বিমূঢ় হয়ে বসে রইল ইরন।
ইরন কিছু বলছে না দেখে সজল বললো,
“কিছু বলবে না?”
“আপনি ফোন রাখুন।”
সজল হাসলো। শুভরাত্রি জানিয়ে কেটে দিলো কল।
________________
খাবার টেবিলে মিনারকে না দেখে শেখ আলী বললেন,
“মিনার কোথায়? ও খাবে না?”
মিনারের মা জানালো,
“ডেকেছিলাম। বললো খাবে না।”
আমিনা চিন্তিত হয়ে বললেন,
“ছেলেটার অসুখ করলো না কি? খাবে না কেন? ডেকে নিয়ে আয় তুই। না খেতে চাইলে তো জোর করে খাওয়াতে হবে। দুপুরেও তো দুই লোকমা ভাত খেয়েছে শুধু, আর কিছু খেলো না। ডেকে আন।”
জেসমিন ছেলেকে ডাকতে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেই ইরন দাঁড়িয়ে বললো,
“আমি যাচ্ছি।”
মিনার শুয়েছিল অন্যপাশ ফিরে। কাঁদছিল। দরজায় দাঁড়িয়ে ওর পিছন দিকটা দেখা যাচ্ছিল। তাই ইরন বুঝতে পারলো না যে মিনার কাঁদছে। সে জিজ্ঞেস করলো,
“হয়েছে কী তোর?”
মিনারের কান্না বন্ধ হয়ে দু কান খাড়া হয়ে উঠলো। তার যতদূর মনে পড়ে সে তো দরজা বন্ধ করে শুয়েছিল। ইরন ঢুকলো কীভাবে তাহলে? না কি সে দরজা বন্ধ করেনি? ইরনের উপস্থিতিতে থমকে যাওয়া অশ্রুর ধারাটা আরও ভারী হয়ে ঝরতে শুরু করলো।
ইরন আরও দুই পা রুমের ভিতরে এসে বললো,
“কী হয়েছে মিনার? কদিন ধরেই দেখছি তুই খাওয়া-দাওয়া করছিস না ঠিকঠাক। কী হয়েছে তোর? শুনলাম আজ দুপুরেও খাসনি, এখনও খেতে চাচ্ছিস না, সমস্যা কী তোর? চল খেতে যাবি।”
কান্নাটাকে টেনে-হিঁচড়ে থামানোর চেষ্টা করলো মিনার। ঢোক গিলে কণ্ঠ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললো,
“খাবো না, তুমি যাও।”
মিনারের গলা শুনেই চমকে গেল ইরন। মনে হচ্ছে যেন কান্না আটকে কথাটা বলেছে মিনার।
“তুই কাঁদছিস?” জানতে চাইলো ইরন।
উৎকণ্ঠা হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তুই কি অসুস্থ বোধ করছিস? আমি কি জাবিদ ভাইয়াকে ডাকবো?”
টেনে-হিঁচড়ে আটকে রাখা কান্না আর আটকে থাকলো না। অবাধে ঝরতে লাগলো। মিনার অধৈর্য হয়ে বললো,
“প্লিজ তুমি যাও। আর দয়া করে কাউকে কিছু বলো না। যাও প্লিজ।”
ইরন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মিনার হঠাৎ কাঁদছে কেন? কেউ কি ওকে মেরেছে? না, ও তো আজ সারাদিনে বাইরে বের হয়নি। তাহলে কী হয়েছে ওর?
ইরন নিচে চলে এলো। আমিনা বললেন,
“কী? ও এলো না?”
ইরনের প্রথমে মনে হয়েছিল মিনারের কান্না করার বিষয়টা সবাইকে জানানো উচিত। কিন্তু কী ভেবেই আবার পারলো না। বললো,
“ও ঘুমাচ্ছে। কেউ আর ওকে বিরক্ত করতে যেয়ো না।”
খেতে বসে শুধু মিনারের কথাই চরকির মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল ইরনের মাথায়। হঠাৎ কী হলো ওর?
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যখন যে যার রুমে যাচ্ছিল তখন ইরন জাবিদকে ডেকে বললো,
“জাবিদ ভাইয়া!”
জাবিদ দাঁড়ালে ইরন ওর কাছে এসে বললো,
“আমার মনে হয় মিনার অসুস্থ। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন ও কাঁদছিল। তুমি তো ডাক্তার। একবার গিয়ে দেখে এসো ওকে।”
জাবিদ বললো,
“ও অসুস্থ নয়।”
ইরন অবাক হয়ে বললো,
“তাহলে?”
জাবিদ উত্তর না দিয়ে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে রইল ইরনের দিকে। ইরনকে বোঝার চেষ্টা করলো। তারপর বললো,
“ওর অসুস্থতার জন্য তুমিই দায়ী।”
বলেই প্রস্থান করলো সে।
ইরন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জাবিদ ভাইয়া কী বললো এসব? ও দায়ী? ও কীভাবে দায়ী হয়? প্রথমে বললো মিনার অসুস্থ নয়, আবার বললো মিনারের অসুস্থতার জন্য ও দায়ী! জাবিদ ভাইয়ার আবার কী হয়েছে? সে উলটা-পালটা বলা শুরু করেছে কেন?
________________
মিনারের রুমের দরজা খোলা পেল জাবিদ। কিন্তু ভিতরে কেউ নেই। এক মুহূর্ত ভাবলো জাবিদ, তারপর ছাদের দিকে চললো।
(চলবে)
#আমার_মন_মেঘ_করেছে (০১)
#লেখা: ইফরাত মিলি
_______________