গল্প# হীরের নাকফুল ও লাল বেনারসি
(২য় পর্ব)

গায়ের হলুদের দুইদিন আগে স্বর্ণার কাজিন দোলা স্বর্ণাকে দেখতে এসে আঁতকে উঠল,

“বিয়ের কইন্যার এই অবস্থা কেন? মনে হয় ঘুমাস না ঠিকমত।চোখের নিচে কালি,ডান গালে দেখি ব্রণ উঠেছে।তোকে যে দুধের সরের সাথে মসুর ডাল বাটার প্যাক বানিয়ে মুখে লাগাতে বলেছিলাম, লাগাচ্ছিস না মনে হয়।”

স্বর্ণা কিছু বলার আগেই স্বর্ণার মা ফেরদৌসী আহমেদ বলে ওঠেন,

“ বিয়ের কইন্যার মনে কী আর আনন্দ আছে? নাকফুল আর লাল বেনারসির দুঃখে কাতর ছিল, এখন আবার মাথায় ঢুকেছে টেনশন।ভাবখানা এমন যেন শত্রুপক্ষের সাথে যুদ্ধে যাবার প্রস্ততি নিচ্ছে।”

মা’র কথা বলার ধরনে স্বর্ণা এবং দোলা দু’জনেই হেসে ওঠে।

ব্যস্ত ভঙ্গীতে স্বর্ণার সুটকেস গোছাতে গোছাতে ফেরদৌসী আহমেদ বললেন,

“ওকে একটু বোঝা।মেয়েদের শ্বশুর বাড়িটাই আসল বাড়ি।ওটাকে পরের বাড়ি ভাবলেই ঝামেলা।আমি এটা ওকে বোঝাতে বোঝাতে টায়ার্ড হয়ে গেলাম।”

স্বর্ণা ওর মা’র সুটকেস গোছানো দেখছিল।

হঠাৎ বলে উঠল,

“ মা, আমার সুটকেসে তোমরা যে মেরুন কাতান শাড়িটা দিচ্ছো বৌভাতে সেটা পরি?”

ফেরদৌসী আহমেদ অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকান।

“বেগুনি রং আমার একটুও পছন্দ না।”

স্বর্ণা ঠোঁট উল্টে বলে।

ফেরদৌসী আহমেদ উঠে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন,

“আর পাগলামি করিস না মা।ওদের বেগুনি শাড়িটাই বৌভাতে পরে নে।লাল বেনারসি বিয়ের পরে না হয কোনো সময় পরিস।শাড়ি নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক জল ঘোলা হয়েছে।”

শাড়ি নিয়ে যে কতখানি জল ঘোলা হয়েছে এটা স্বর্ণার গায়ে হলুদের সন্ধ্যায় স্পষ্ট বোঝা যায়।

চেয়ারে বসে একথা-সেকথার পর শাহেদের বড় বোন আচমকা মুখ বাঁকিয়ে বলে ওঠে,

“এখনকার মেয়েরা খুব নির্লজ্জ হয়,সংসার শুরু করার আগেই বরের কাছে নির্লজ্জের মত নিজের শখের কথা বলে ফেলে।আমাদের সময় আমরা এটা কল্পনা করতে পারতাম না।”

শাহেদের ছোট চাচী মুখ টিপে হেসে বলে ওঠে,

“ এখনকার মেয়েরা সংসার শুরু করার আগেই বরের ব্রেইন ওয়াশ করে ফেলতে চায়।”

স্বর্ণাদের বাড়ির লোকজন নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে।

স্বর্ণার বড় ফুপু কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই স্বর্ণার মা চোখের ইশারায় থামিয়ে দেন।

পরিবেশটা থমথমে হয়ে ওঠে।
স্বর্ণার বান্ধবীদের হাসাহাসি, কমবয়সী মেয়েদের প্যারোডি গান,নাচ,হৈচৈ-সবকিছুর পরেও কোথায় যেন সুর কেটে যায়।

ছেলের গায়ে হলুদের দিন শাহেদের কাজিন ও ছোট বোনের বান্ধবীরা স্টেজে উঠে সুরে সুরে প্যারোডি গায়, ফেরদৌস ওয়াহিদের গাওয়া “ঘোমটা দিয়া চল রে মাইয়া” গানটার সুর অবিকৃত রেখে নিজেদের কথা বসিয়ে দিয়ে সুরেলা গলায় গেয়ে ওঠে,

“ ঘোমটা দিয়া চল রে স্বর্ণা,
চোখের পর্দা খুলিস না,
দোহাই লাগে আর কারো সর্বনাশ তুই করিস না।”

স্বর্ণাদের বাড়ির সবাই ব্যাপারটা হালকা ভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে।
মজা করে প্যারেডি গান তো তাদের বাড়ির মেয়েরাও স্বর্ণার গায়ে হলুদে করেছে।

বিয়ের দিনও হাসি মুখে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে কথা বলা অব্যাহত থাকে।

বিদায় বেলায় স্বর্ণার বাবা স্বর্ণার হাতটা শাহেদের বাবার হাতে তুলে দিতে দিতে কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন,

” আমার মেয়েটাকে আপনাদের হাতে তুলে দিলাম।আজ থেকে ওর সব দায়িত্ব আপনাদের।”

স্বর্ণার মা শাহেদের মা’র দিকে তাকিয়ে রুদ্ধ গলায় বলেন,

” আপা, আমার এই মেয়েটা খুব শান্ত।কখনো ওকে নিয়ে আমার কোনো ঝামেলা হয় নাই।ও সবার আদরে বড় হয়েছে। আমি ওর সাথে কখনো জোরে কথা বলি নাই।কখনো একটা বকা দেই নাই।আমার মেয়েটাকে কখনো কষ্ট দিবেন না।”

স্বর্ণা ফ্যাকাশে মুখে বসেছিল।
বুকের ভেতরের দ্রিম-দ্রিম শব্দটা স্পষ্ট শুনতে পারছিল।
হঠাৎ শরীর কাঁপিয়ে হুড়মুড় করে কান্না এল।
স্বর্ণা কাঁদতে কাঁদতে একবার বাবাকে জড়িয়ে ধরল, আরেকবার জড়িয়ে ধরল মাকে।
গাড়িতে ওঠার আগে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল আরেকবার।
চীৎকার করে বলে উঠতে চাইল,

“মা, আমার ভীষণ ভয় করছে।তোমরা আমাকে কোথাও যেতে দিও না।”

মিষ্টি ছিল না, তাই শাহেদদের বাড়িতে যাওয়ার পর এক চামচ চিনি দিয়ে স্বর্ণাকে বরণ করে নেওয়া হল।
শাহেদের মা রাগে গজগজ করতে করতে বললেন,

“নতুন বৌকে বরণ করার মিষ্টি আমি নিজের হাতে ফ্রীজে রেখে বিয়ে বাড়িতে গেলাম ।এখন সেটা হাওয়া।একটা মিষ্টিও নাই।খালি বাক্সটা শুধু ফ্রীজে আছে।আজব ঘটনা!”

বড় ননাস হাসতে হাসতে বলল,

“ মা,বিয়ে বাড়িতে এমন হয়।কালকে মিষ্টি আনিয়ে মনের সাধ মিটিয়ে ছেলের বৌকে মিষ্টি খাওয়ালেই তো হয়ে গেল।”

ড্রইং রুমে এক ঘর লোকের সামনে সংকুচিত হয়ে বসে রইল স্বর্ণা।
তখনও চোখে চিকচিক করছে জল, মুখে লেগে রয়েছে কান্নার দাগ।স্বর্ণার মেঝো ননাস টিসু দিয়ে আলতো করে ওর মুখটা মুছিয়ে দেয়।

ছবি তোলার পর্ব শেষ করে শাহেদের ছোটো বোন রেহনুমা ওকে ঘরে নিয়ে গেল।নরম গলায় বলল,

“ ভাবী,তোমার কিছু লাগলে অবশ্যই আমাকে বলবে।”

শাহেদের খালাতো ও চাচাতো দুই ননদ তখন ঘরে এসে ঢুকল।

স্বর্ণার পাশে বসে জিজ্ঞেস করল,

“ ভাবী, তোমার বাসর ঘরের ফুলের সাজ পছন্দ হয়েছে?

স্বর্ণা মুগ্ধ চোখে ঘরের চারদিকে তাকাল।
গোলাপ, রজনীগন্ধা দিয়ে পুরো ঘরটা ভীষন সুন্দর করে সাজানো।

মুগ্ধ গলায় বলল,

“ খুব সুন্দর।”

“কার পছন্দে এই সাজ হয়েছে জানো?

“ কার পছন্দে?”

“তোমার বরের পছন্দে।”

স্বর্ণা লাজুক ভঙ্গীতে হাসে।

ঠিক তখনই শাহেদ এসে ঘরে ঢোকে।

ননদরা উঠে দাঁড়ায়।

“ ভাবী আমরা গেলাম।”

ঠোঁটে অর্থপূর্ণ হাসি ছড়িয়ে চাচাতো ননদ চোখ টিপে বলল,

“গুড নাইট, ভাবী।”

স্বর্ণা আবার ব্লাশ করে, মনে অদ্ভুত এক শিহরণ খেলে যায়।

শাহেদ স্বর্ণার দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় বলল,

“তুমি কিছু খাবে স্বর্ণা? বিয়ে বাড়িতে ঠিকমত খাওয়া হয়নি মনে হয়।”

স্বর্ণা মাথা এদিক ওদিক নেড়ে বলল,

“ না, বড় আপা নিজের হাতে আমাকে খাইয়ে দিয়েছিল।”

“ তাই ? ঠিক তো?”

“ হুম, আমি ঠিক আছি।”

“ তুমি একটু রিল্যাক্স হয়ে বসো তো।বিয়ের স্টেজে ঘাড় নিচু করে যেভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা বসেছিলে!”

সবার আন্তরিকতায় স্বর্ণার আড়স্টতা ততক্ষণে অনেকটাই কেটে গেছে।ও সহজ হয়ে বসল।

শাহেদ ওর পাশে বসতে বসতে বলল,

“ তুমি কোন দিকে ঘুমাও, ডানদিকে নাকি বামদিকে?”

“ একপাশে ঘুমালেই হয়, সমস্যা নেই।”

স্বর্ণা আলগা গলায় বলে।

শাহেদ প্রশ্ন করে,

“সারারাত এসি চললে তোমার অসুবিধা নেই তো?”

“যদি বলি আমি বেশীক্ষণ এসির রুমে থাকতে পারি না।আমার ঠান্ডা লেগে যায়।”
চোখ ঘুরিয়ে স্বর্ণা বলল।

“ আমি তাহলে তোমার মুখের দিকে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকব।তাতেই আমার দেহ, মনে শীতল হাওয়া বইবে।”

শাহেদের কথার ধরনে স্বর্ণা সশব্দে হেসে ওঠে।

স্বর্ণার চোখে চোখ রেখে হাসিমুখে শাহেদ বলে,

“ শুনলাম গায়ে হলুদের দিন তোমাকে খুব সুন্দর লাগছিল।আমাদের বাসার সবাই ফিরে এসে বলেছিল।আমার খুব ইচ্ছা করছিল তোমায় সেদিন দেখতে।

“ ওহ্ ! তাই বুঝি।”

স্বর্ণা চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে।

শাহেদ বিহ্বল চোখে স্বর্ণার দিকে তাকায়।গভীর গলায় বলে,

“ গোল্ডেন কালারের শাড়িতে তোমাকে খুব মানিয়েছে।”

“থ্যাংকস।”

লজ্জিত গলায় স্বর্ণা বলে।
লজ্জা ঢাকতে খোঁপার বেলীফুলের মালা গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।হাতের চুড়ি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে।

শাহেদ সেদিকে তাকিয়ে বলে,

“ দেখি, তোমার হাতের মেহেদী কেমন লাল হয়েছে।”
বলে স্বর্ণার হাত ধরে।
স্বর্ণা আমুল কেঁপে ওঠে।

ঘরের বাতাসে তখন গোলাপ, রজনীগন্ধা ও বেলীর মিলিত মিষ্টি একটা গন্ধ।
বাইরে তখন ভরপুর জোস্না,গলে গলে পড়ছে চাঁদ।
স্বর্ণার মনের আকাশে মেঘভাঙা সোনা গলা রোদ।
সেই রোদ, জোস্না গায়ে মেখে ভালোবাসার থৈ থৈ আবেগে ভেসে যায় স্বর্ণা।

পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে স্বর্ণা যখন খেতে বসে তখন ওর আচরণে কোনো জড়তা নেই।ফুরফুরে মেজাজে দেবর-ননদদের সাথে কথা বলছে, হাসছে।

সবাইকে ওর ভালো লাগে।সবচাইতে ভালো লাগে ওর শ্বশুরকে।
সারাক্ষণ মুখে একটা স্নিগ্ধ হাসি ধরে রেখে কোমল গলায় কথা বলেন।নিজে স্বর্নার প্লেটে খাবার তুলে দেন।

স্বর্ণা আড়চোখে শাশুড়ির মুখের দিকে তাকায়।শাশুড়ির মুখটা গম্ভীর।বড় ননাসের মুখটাও কেমন যেন ভাবলেশহীন।

তিন দিন পর বৌভাত।
এই তিন দিন সারাক্ষণ বাড়িতে লোকজন আসছে, যাচ্ছে।স্বর্ণা সবার সাথে সহজ সুরে এমন ভাবে কথা বলছে যেন সবাই ওর অনেক দিনের পরিচিত।

বৌভাতের দিন তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে পার্লারে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়।

বড় ননাস ছোট ননদকে ডেকে বলে,

“ আ্যাই রেহনুমা,স্বর্ণার বৌভাতের শাড়ি-টাড়ি সাথে করে নিয়ে নে।”

রেহনুমা শাড়িটা গুছিয়ে ব্যাগে ভরে নেয়।স্বর্ণা মনোযোগ দিয়ে শাড়িটা দেখে।কালচে বেগুনি রংয়ের শাড়িটায় হাওয়াই মিঠাই রংয়ের পার,পুরো শাড়ি জুড়ে হাওয়াই মিঠাই রংয়ের বড় বড় ফুল।

শাড়িটা দেখে স্বর্ণার মাথা প্রথমে চক্কর দিয়ে ওঠে,পরে প্রচন্ড মন খারাপ হয়।মনে একটা কান্নার ভাব জেগে ওঠে।কান্নাটা এক নিমেষে ও গিলে ফেলে।

মন খারাপ ভাব গোপন করে হাসি হাসি মুখ করে স্বর্ণা ঘর থেকে বের হয়ে আসে।

মেয়েরা দল বেঁধে হৈ-চৈ করতে করতে পার্লারে যায়।

স্বর্ণার মেকআপ শুরু করার পঞ্চাশ মিনিট পর ইলেকট্রিসিটি চলে গেল।পার্লারের সবচাইতে সিনিয়র বিউটিশিয়ান পলিন মৃদু হেসে জানালেন যে তাদের জেনারেটর দুপুর থেকে কাজ করছে না।তারপর অবশ্য খুব স্মার্ট ভঙ্গীতে এটাও জানালেন যে চার্জ লাইটের আলো দিয়ে মেকআপের কাজটা বিউটিশিয়ানরা দিব্যি চালিয়ে নিতে পারবে।আত্মবিশ্বাসের সাথে তিনি জোর গলায় বললেন,

“ আমি এত বউ সাজিয়েছি যে চোখ বন্ধ করেও সাজাতে পারি।কোনো সমস্যা হয় না।”

স্বর্ণাকে তিনিই সাজাচ্ছিলেন।
উনি দ্রুত মেকআপ শুরু করেন।
স্বর্ণা চাপা উদ্বেগ নিয়ে ইলেকট্রসিটি আসার অপেক্ষা করতে থাকে।
ওর মেকআপ শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট পর ইলেকট্রিসিটি আসে।

আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে স্বর্ণা ভুত দেখার মত চমকে ওঠে।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here