“প্রেমে পড়া বারণ”
পর্ব ৫
রমিলা ভাবছে জলিল ওকে এই গ্রাম গ্রাম দেখতে কোন এলাকায় নিয়ে এলো ?
পাশেই একটা ছোট নদী আর তার তীর ধরে ঘন কাশবন, একদম ছবির মতো।
কিন্তু জায়গাটা খুব নির্জন।
ওরা বাসে করে এত দূর এসেছে, কিন্তু কি করে ফেরত যাবে কে
জানে ?
জলিল একটা সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করছে , কিন্তু দমকা হাওয়ায় আগুন নিভে যাচ্ছে বার বার ।
—এইটা আমরা কোন জায়গায় আসলাম ?
রমিলার গলায় সামান্য ভয় আর উৎকন্ঠা।
—এইটা বসুন্ধরার একদম শেষ মাথা।
কিন্তু রমিলার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না।মনে হচ্ছে ওরা শহর ছেড়ে অনেক দূর চলে এসেছে। যদিও জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর, তবুও কেমন যেন গা ছম ছম করছে।আশেপাশে তেমন কোন লোকজন নেই ।
ওরা দুজন নদীর পাড়ে এসে বসল। কি সুন্দর হাওয়া বইছে । রমিলার এলোমেলো চুল গুলো বাতাসে উড়ছে। জলিল কোথা থেকে একটা লাল জবা ফুল এনে রমিলার চুলে পরিয়ে দিল।
অদূরে বসে একজন বয়স্ক আর্টিস্ট প্রকৃতির ছবি আঁকছিলেন। পুরো ঘটনাটি তার চোখ এড়ালো না।
এই অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যটি তিনি তৎক্ষণাৎ স্কেচ করে নিলেন।
জলিল একটু কাছে বসে রমিলার কানে কানে বললো ,
—আমারে বিয়া করবি না কি সুন্দরী?
রমিলা সে কথা শুনে চমকে উঠলো ! জলিল এতো তাড়াতাড়ি বিয়ের প্রস্তাব দেবে সেটা সে আশা করেনি। সে উত্তরে কি বলবে বুঝে পাচ্ছে না । তার দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে ঝরছে। এত আনন্দ আর সুখ কি তার কপালে সইবে ?
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ঐন্দ্রিলা আর তন্ময় গাড়িতে করে চলছে তো চলছেই, পথ আর ফুরচ্ছে না।
ঐন্দ্রিলা একবার জিজ্ঞাসা করল ,
—আচ্ছা আমরা কোথায় যাচ্ছি ?
উত্তরে তন্ময় কিছু বলছে না , শুধু মিটিমিটি হাসছে ।
একসময় গাড়ি এসে থামলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনে।ইংরেজ আমলে লর্ড কার্জনের তৈরী করা লাল ইটের ভবনগুলো এতো শত বছর পরও কি রকম রাজকীয় ভাবে
দাঁড়িয়ে আছে।অনেক পুরোনো নাম না জানা গাছ গাছালী ঘেরা চারদিক কেমন এক প্রশান্তিতে ছেয়ে আছে ।কত বছরের পুরানো ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে এই দালানগুলো।
তন্ময় বলল ,
—ঐন্দ্রিলা, আমি নিশ্চিত তুমি ভাবছো কেন তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম ? এর পেছনে একটা ছোট্ট কাহিনী আছে। আমার দাদুভাই আর দাদীমা ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র ছাত্রী ছিলেন । তাদের প্রণয়ের শুরুটা হয়েছিলএই কার্জন হলে।আমিও চেয়েছিলাম আমাদের ফার্স্ট ডেট যেন এখানেই হয়।
ঐন্দ্রিলা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছে, কিছু বলার মত তেমন খুঁজে পাচ্ছে না। তন্ময় তো দেখা যাচ্ছে তার নিজের চেয়ে আরও বেশী
সেকেলে।
দারুণ মিল তো তাদের দুজনের !
গাড়ী থেকে নেমে তারা দুজন কিছুক্ষণ হাঁটল। কি সুন্দর হরেক রঙের ডালিয়া ফুল ফুটে আছে।
তারা হেঁটে হেঁটে শহীদুল্লাহ্ হলের পুকুরটার ধারে এসে বসল। পড়ন্ত বিকেলের আলো ছায়ায় চারদিক অপার্থিব লাগছে ।
ঐন্দ্রিলা ভাবছে সে কি স্বপ্ন দেখছে ?
তন্ময় বেশীর ভাগ কথা বলছে। ঐন্দ্রিলা শুধু হু হা করছে । তার জড়তা এখনও কাটেনি ।
একটা ছোট্ট ছেলে বাদাম বিক্রি করছে ,
—আপা বাদাম কিনবেন ?
—না লাগবে না, তুমি যাও।
ঐন্দ্রিলা আস্তে করে বলল। সে কখনও জোরে ধমক দিয়ে কথা বলতে পারে না।
—আপা, আপনাদের ছবি তুইল্লা দিবো যদি এক ছটাক বাদাম কিনেন।
অকালপক্ব ছেলেটা দেখা যাচ্ছে একেবারে নাছোড়বান্দা, পিছু লেগেই আছে।
কি আর করা, না পারতে তন্ময় বাদাম কিনে নিল।
স্মার্ট ফোনে একটা ছবি তোলা হল বাচ্চা ছেলেটার বদৌলতে।
বলাই বাহুল্য, তন্ময় আর ঐন্দ্রিলা, অন্যান্য সব মিলেনিয়াল কিংবা জেনারেশন ‘ওয়াই’দের থেকে একটু ভিন্ন স্বভাবের।
এদের দুজনের কারোর কোন সোসাল মিডিয়ার একাউন্ট নেই।
রূপসার মতানুসারে ঐন্দ্রিলার চাইতে তার দাদী অনেক বেশি স্মার্ট । তিনি সারাদিন ফেসবুকে অসম্ভব এ্যাকটিভ, কারোর ছবি কিংবা স্টেটাস উনি মিস করেন না , আর প্রায়শ তিনি বিভিন্ন ধরনের রান্নাবান্নার ছবি পোস্ট করেন।
কার্জন হলে সময় সেদিন যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল ।
—ঐন্দ্রিলা, আমি কি একটু তোমার হাত ধরতে পারি ?
তন্ময় খুব কাছে এসে বসল।
ঐন্দ্রিলা একটু যেন কেঁপে উঠল। তারপর ঐন্দ্রিলা নিজেই হাত বাড়িয়ে দিল। তন্ময় ঐন্দ্রিলার হাত দুটি তার দৃঢ়মুষ্টিতে ধরে রাখল।
হঠাৎ বিকট সুরে ঐন্দ্রিলার মোবাইল বেজে উঠল।
ঐন্দ্রিলা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ব্যাগের ভেতর মোবাইল খুঁজতে।
রূপসা তারস্বরে চিৎকার করছে মোবাইলের অন্য প্রান্তে।
—ইউরেকা ! ইউরেকা !!! ঐন্দ্রিলা, তোর রহস্ জনক
বেহালাবাদকের পরিচয় উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি ! এখন বল কোথায় খাওয়াবি ?
ঐন্দ্রিলা ফিস ফিস করে বলল,
—আমি এখন একটু ব্যস্ত আছি, তোকে পরে ফোন দিচ্ছি।
—না , না , না …. খবরদার ফোন রাখবি না। তোর এখনই শুনতে হবে ! যা ভেবেছিলাম, সেই বেহালা বাদক বিদেশ থেকে সদ্য আগত, সে না কি ………
রূপসা কিছু না শুনেই অনর্গল বলে চলেছে।
ঐন্দ্রিলা ফোন কেটে দিল। আর ফোনের রিন্গার অফ করে দিল।
ধুর ছাই! এত অসাধারণ মুহূর্ত টা একেবারে নষ্ট হয়ে গেল !
তন্ময় বলল ,
—ঐন্দ্রিলা, চলো কোথাও ডিনার করতে যাই।
ঐন্দ্রিলা ঘড়ি দেখে বললো ,
—আজ না আরেক দিন। আসলে মা রাত্রে বেশীক্ষণ বাইরে থাকা পছন্দ করেন না ।
তন্ময় আর জোর করলো না ।
ফেরার পথে ঐন্দ্রিলা আরও চুপ হয়ে গেল ।পাশে তন্ময় বসে আছে, হাত বাড়ালে তাকে ছোঁয়া যায় । তবুও কেন যেন সেই বেহালাবাদকের কথা মাথা থেকে সরাতে পারছে না।
বাড়ি গিয়ে রূপসাকে ফোন করতে হবে।
কে হতে পারে সে রহস্যময় ব্যক্তি ?
—-বিপাশা বাশার
(চলবে)