“প্রেমে পড়া বারণ”
পর্ব ৩
—কি বলছিস ? কে এই বেহালা বাদক কিংবা বেহালাবাদিকা? রূপসা ভীষণ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো।উত্তেজনায় সে বসে থাকতে পারছে না।
—বললাম না, কিছুই জানি না। সার্ভিস এ্যাপার্টমেন্ট থেকে সুর ভেসে আসছিল।
ঐন্দ্রিলা একটু অন্যমনস্ক হয়ে বললো। বেহালার সেই সুর এখনও তার কানে বাজছে।
—সার্ভিস এ্যাপার্টমেন্টে যেহেতু উঠেছে নিশ্চয়ই লোকাল কেউ নয়। খুব সম্ভবত বিদেশ থেকে বেড়াতে এসেছে। আবার বিদেশীও হতে পারে। ও মাই গড ! এমনও তো হতে পারে কোন এক বিদেশী বুইড়া ব্যাটা !
— কি যা তা বলছিস ?
— আরে না না, শোন আমার কথা ! ব্যাটা হয়তো হিউমেন ট্রাফিকিং-এর সাথে জড়িত।নেটফ্লিক্সে একটা ডকুমেন্টরীতে দেখেছিলাম। এরা তোর মতো খুব সুন্দরী কিন্তু ‘আনসোস্যাল লোনার’ টাইপ মেয়েদের টারগেট করে। তারপর এদের কিডন্যাপ করে পাচার করে দেয় মিডল ইস্টের হাই ক্লাস ব্রথেলে!
রূপসা এক নাগাড়ে বলে গেল। ওর উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছে গেছে ।
—তোর মনে যা আসে তাই বলে দিস! কি সব যা তা বলছিস ? সারাদিন এসব ডকুমেন্টরী দেখতে দেখতে তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে রে।বাস্তবে কি আর সব সময় এই সব হয় ?
ঐন্দ্রিলা ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলল।
—আমি বলে দিচ্ছি তোকে, তুই খবরদার আর ওই বারান্দায় যাবি
না আর। হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালার মতো তোকে বেহালা বাজিয়ে
প্রলোভন দেখাচ্ছে। দাঁড়া, আজই একটা স্পাই প্রজেক্ট করতে হবে, ‘‘অপারেশন বেহালা বাদক ‘ !
ঐন্দ্রিলা ভাবছে কেন যে এই সব কথা রূপসা কে সে জানাতে গেল ?
ও কিরকম করে যেন সব কিছু খুব ড্রামাটিক করে ফেলে। এখন একটা প্রজেক্টও বানিয়ে ফেলেছে ।
উফ্! আবার এই বাড়তি ঝামেলা ! কথায় আছে না ,
“ পাগল কে সাঁকো নাড়াতে বলতে নেই !”
—তোদের ড্রাইভার জলিলকে ডাক তো ঐন্দ্রি। এখনই খবর নিতে হবে কে উঠেছে ঐ সার্ভিস এ্যাপার্টমেন্টে যার লাগেজের সাথে বেহালার কেইস ছিল। তুই জানিস না, বাড়ির ড্রাইভার আর বুয়ারা আজকালকার মডার্ন ডে স্পাই !
রূপসা বসে বসে একটা কাগজে কিসব লিখছে প্ল্যান করছে।
ঐন্দ্রিলার মোবাইলে রিং বাজছে। সে দৌড়ে ঘরে গেল ফোন তুলতে। কিন্তু ততক্ষণে মিসকলে চলে গেছে।
নাম্বারটা অচেনা। মনে হয় কোন সেল্স কল ছিল ।
ঐন্দ্রিলা ঠিক করল আজ আর রূপসাকে গোলাপ প্রেরকের
গল্প বলবে না। আজকের মতো ওকে “অপারেশন বেহালা বাদক” নিয়ে ব্যস্ত রাখাই ভাল হবে। নইলে “ অপারেশন পুষ্প “ নামে আরও একটি প্রজেক্ট শুরু করে দেবে ।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
রমিলা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে বড়ো আপার বান্ধবী রূপসা আপা ফিস ফিস করে জলিলের সাথে গোপনে কি যেন বলছে। জলিল হেসে বারবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছে।
রমিলার মনে মনে একটু ঈর্ষা হল। বড়ো আপার সুন্দরী বান্ধবীর সাথে এতো ঘনিষ্টতার কি আছে জলিলের ? আর এত দাঁত কেলাচ্ছে কোন আনন্দে ?
রমিলার মনে হঠাৎ করেই মেঘ জমে উঠেছে। জলিলের উপর কোন কারণ ছাড়াই রাগ উঠছে এখন।
বাড়ীর ছোট মেয়ে, ঐশীর রুম ঝাড়ু দিতে গিয়ে রমিলা দেখে সব কিছু এলোমেলো অবস্থা। বিছানার চাদর অর্ধেক উল্টানো, বালিশ গুলো সব মাটিতে আর এঁটো খাওয়ার প্লেটগুলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে। কাল রাতে ঐশীর বন্ধুদের স্লিপ-ওভার পার্টি ছিল। মেয়েগুলো সারা রাত জোরে জোরে গান শুনেছে, অকারণেই খিল খিল করে হেসেছে, টিকটক ভিডিও করেছে।
আহা ! ওদের মতো ভাবনাহীন, বন্ধনহীন জীবন যদি রমিলার
হতো। ওদের কাছাকাছি বয়স হলেও রমিলার জীবন আর ঐশীদের জীবনে কত না আকাশ পাতাল পার্থক্য !!
হঠাৎ খাটের নিচে কি একটা সিগারেটের মতো কি একটা জিনিস রমিলার দৃষ্টিগোচর হলো।
—ও আল্লাহ্ এরা কি সিগারেটও খায় না কি ? দারুণ দস্যুর দল তো মেয়েগুলি !
রমিলা একান্তভাবে ভাবলো।
সিগারেট হোলডারের মতো জিনিসটা তুলে রমিলা নিজের কাছে লুকিয়ে রাখল। জলিলকে জিজ্ঞাসা করবে এইটা কি জিনিস ।
ছোট আপার মেকআপ গুলি আর গয়না রমিলার খুব পছন্দ । সে কিছুক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কানের দুল, মালা, চুড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরে দেখলো।
কাল রাতে ছোট আপার রুমে সে যখন খাওয়া দিতে এসেছিল, তখন ঐশীর বন্ধুরা সবাই সাজগোজ করছিল। ওরা জোর করে রমিলা কে সাজিয়ে দিল, কড়া লাল লিপস্টিক, নতুন আইসেডের প্যালেট তারা রমিলার উপর একসপেরিমেন্ট করল।
—ঐশী, লুক লুক , ইওর মেইড লুকস লাইক বলিউড এ্যাকট্রেস আলিয়া ভাট !
সে কথা ভেবে রমিলা মিটি মিটি হাসছে। আল্লাহতালা তো তার চেহারা নায়িকাদের মতো অসাধারণ সুন্দর করে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্যের দোষে ওর এখন মানুষের বাড়ীতে কাজ করতে হয়।
—ও রে আমার জান, তোমারে তো একদম কারিনা কাপুরের মতো লাগতাসে !
জলিল কখন এই রুমে এসেছে, রমিলা লক্ষ্যই করেনি। রমিলা এক ঝটকায় সব গয়না খুলে ফেললো।
—অনেক দিন ডেটিংয়ে যাওয়া হয়নি, জান।
জলিলের গলায় একটু মিথ্যে আক্ষেপের সুর।
রমিলাও কপট রাগে বলল ,
—আমি এখন বিজি, পারবো না।
—আমার তো আর তর সয় না রে । মনে হয় তোমারে নিয়া ভাইগা যাই, সুন্দরী !
জলিলের কথা শুনে ধীরে ধীরে রমিলার মনের বরফ গলতে শুরু করেছে।জলিল ব্যাটা ভালই পটাতে পারে। রমিলা মাথা নিচু করে মুচকি হেসে চলে গেল।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
—হ্যালো , তুমি কি ঐন্দ্রীলা ?
ফোনের ওপাশের ভরাট গলাটা অচেনা লাগছে ঐন্দ্রীলার।
—হ্যাঁ ঐন্দ্রীলা বলছি। আপনি কে বলছেন ?
—তুমি আমাকে চিনবে না। আমার নাম আবরার। আমি তোমাকে ক্যাম্পাসে দূর থেকে দেখেছি। কিন্তু কখনও কথা হয়নি। কম্পিউটার সাইন্সেসের ফাইনাল ইয়ারে পড়ছি আমি।
—ও আচ্ছা। তা কি মনে করে আমাকে ফোন করেছেন ? একটু তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন প্লিজ , আমি খুব ব্যস্ত আছি।
কাল আমার একটা এসাইনমেন্ট ডিউ আছে।
ঐন্দ্রীলা যথেষ্ট ভদ্রতার সাথে ফোন রাখার চেষ্টা করল।
—আমি কি তোমাকে কফিতে নিয়ে যেতে পারি একদিন ? কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল তোমার সাথে।
—জী , কিছু মনে করবেন না । আমি আগামী একমাস ফাইনালের আগ পর্যন্ত ভীষণ ব্যস্ত আছি। সরি, কফির নিমন্ত্রণ রাখতে পারছি
না । আজ ফোন রাখলাম, বাই।
ঐন্দ্রীলা ফোন রেখে ভাবলো কেন যে এরকম ভাবে ছেলেরা ওকে জ্বালাতন করে !
এদিকে ঐন্দ্রীলা ভাবছে কে ঐ লাল গোলাপগুলো পাঠালো ? এই আবরার নামের ছেলেটা না তো? সেই রহস্য তো উদ্ঘাটন হলো না এখনও।
ঐন্দ্রীলার মোবাইল আবারও বেজে উঠল।
সকাল থেকে একটা অজানা নাম্বার থেকে বারবার কল আসছে । সে ভেবেছিল সেলস কল। কিন্তু এ নিয়ে প্রায় দশ বার কল এলো।
কে জানে আবার কোন উপদ্রব ?
কে হতে পারে ?
এসব কথা ভাবতে ভাবতে, ঐন্দ্রীলা মনের অজান্তেই কলটা ধরে বসলো।
—মে আই স্পিক টু ঐন্দ্রীলা প্লিজ?
ছেলেটার গলাটা অচেনা কিন্তু কথা বলার ভঙিটা অবশ্য একটু চেনা চেনা মনে হচ্ছে।
—দিস ইজ শি। মে আই নো হু ইজ কলিং ?
—দিস ইজ তন্ময় ! ইউর ওল্ড এডমায়েরার !
একটু চাপা হাসি শোনা গেল ফোনের অপর প্রান্তে।
—মানে মানে ….তুমি শিং মাছ ?
ঐন্দ্রীলা অবাক হয়ে গেছে।
—আহা, কেন যে তোমরা আমাকে এই বিদঘুটে নামটা দিলে ? আমি কি এতোই পচা ছিলাম না কি দেখতে ?
তন্ময় একটু ইংলিশ এ্যাকসেন্টে বাংলা বলছে। কিন্তু ঐন্দ্রীলার শুনতে মোটেই খারাপ লাগল না। বরং ভিন্নতার জন্য ভালো শোনাচ্ছে ।
—না মানে রূপসা মজা করে বলতো আর কি ?
ঐন্দ্রীলা হাসতে লাগল পুরোনো কথা ভেবে।
—ঐন্দ্রীলা, তুমি কি এখনও জেইন অস্টেন পড়ো ? জানো, তোমার কথা ভাবলেই আমার মনে হয়, মোটা কাঁচের চশমা পড়া মেয়েটি যার হাতে সব সময় জেইন অস্টেনের বই থাকতো।
ঐন্দ্রীলার মাথায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চমক খেলে গেলো !
শুক্রবারে গোলাপফুল, চকলেট আর জেইন অস্টেনের বাণী …..
সব কিছু মিলে যাচ্ছে, ফুলের প্রেরক নিশ্চয়ই এবং অবশ্যই
“শিং মাছ” ওরফে তন্ময় !
-বিপাশা বাশার
(চলবে )