দুঃখগাথার রাজকন্যা
কলমে:লাবণ‍্য ইয়াসমিন
পর্ব:৯

আরাভের সারা মুখে বিষন্নতার ছাপ। বিষয়টা কেমন জঘন্য লাগছে। ও মানুষের ভালো খারাপ দোষারোপের কথা ভাবছে না। লোকজন কাজকর্ম না থাকলে অন‍্যর গুণগান করে এতে বিচলিত হবার কিছুই নেই। কিন্তু নিজেরও তো একটা বিবেক আছে। রাত্রীর জন্য ওর চিন্তা হচ্ছে। নিজের সুবিধা ভাবতে গিয়ে ওকে ডিভোর্সী হতে বাধ্য করা হলো। ও সামাজিকভাবে ছোট হয়ে যাবে। মেয়েটার জীবন এবার কঠিন হয়ে উঠবে। ওই বাড়িতে থাকাটা ওর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে। আরাভের ধ‍্যান ভাঙলো রাত্রীর কথা শুনে,
> আপনি কি আমাকে নিয়ে চিন্তিত?
> একটু।
> আচ্ছা আপনি কাউকে পছন্দ করেন না? যদি করতেন তাহলে ভালো হতো। এতো লেখাপড়া করেছেন কখনও কাউকে মনে ধরেনি?

> আমি সৌন্দর্য্যের পুজারী হতে চাইনি। আমি কর্ম দিয়ে মানুষ যাচাই করি।

> মুখে বললেই হয়না। কোথাও না কোথাও আপনিও ঠিক ওই দশটা মানুষের মতোই।

রাত্রীর কথায় আরাভ কিছুই বলল না। ও চুপচাপ খেয়ে চলেছে। উপরে তমাল এখনো ঘুমিয়ে আছে। অনেকবার ডেকেছিল তবুও তার ঘুম ভাঙেনি। আরাভ খাওয়া শেষ করে চুপচাপ উপরে চলে গেলো। রাত্রি লাল রঙের একটা শাড়ি পড়েছে। কলোর মধ্যে লাল রঙটা একটু বেশিই বিদঘুটে লাগছে। কালো হলে একটা সুবিধা আছে সাজুগুজু করার তেমন ঝামেলা হয়না। কাপড়ের পুটলির মধ্যে একখানা কালো টিপের পাতা ছিল। আম্মা রাস্তার ফেরিওয়ালার থেকে কিনে দিয়েছিলেন। টিপের পাতার থেকে শুধুমাত্র একটা টিপের ব‍্যবহার হয়েছে। রাত্রী পাতাটা নাড়াচাড়া করে ভাবলো একটা পড়ি তারপর নিজের মুখের কালো রঙটা দেখে নিরাশ হলো। কালোর সঙ্গে কালো মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। লাল হলে ভয়ংকর সুন্দর লাগবে। মানুষ দেখলে ভয়ে পালাবে কথাটা ভেবে ও আপন মনে হেসে উঠেছিল। কথাগুলো ভেবে ও তমালের জন্য চা নাস্তা নিয়ে উপরে আসলো। এতক্ষণে তমাল বিছানায় বসে বসে ঝিমুচ্ছে। রাত্রী ওকে এভাবে ঝিমাতে দেখে শব্দ করে হেসে উঠলো। ওর হাসির শব্দে সারা ঘরজুড়ে ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো। তামালের ঘুম ভাবটা কেটে গেলো ওর হাসির শব্দ শুনে। রাত্রীর হাসিটা কাঁটতেই চাইছে না। বাথরুমের দরজায় টাওয়েল হাতে রাত্রীর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরাভ। মেয়েটার হাসির শব্দটা ভীষণ মিষ্টি। কিন্তু এভাবে হাসির কি হলো কে জানে। তমাল বিছানা থেকে নেমে পা ঝুলিয়ে দিয়ে বলল,
> হাঁসছো কেনো?
রাত্রী কোনো রকমে নিজের হাসি থামিয়ে বলল,
> আপনি মুরগি মতো ঝিমাচ্ছেন।
কথাটা বলে রাত্রী আরেক দফা হেসে নিলো। ওর এমন হাসতে দেখে আরাবের এবার রাগ হচ্ছে। ওর মনে হলো মেয়েটার কমনসেন্সের অভাব আছে। বাড়িতে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির পরেও কিভাবে ও এমন করে ঠান্ডা মাথায় হাসছে আল্লাহ্ জানে। কথাটা ভেবে ও ধমক দিয়ে রাত্রীকে থামানোর চেষ্টা করলো। মেয়েটা তবুও মুখ টিপে হাসতে হাসতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আরাভ ভ্রু কুচকে তমলের দিকে তাঁকিয়ে আছে। ওর মুখটা এমন গম্ভীর দেখে তমাল ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটিয়ে বলল,
> মেয়েটা কিন্তু দারুন তোর সঙ্গে বেশ মিলবে। একদম পারফেক্ট।
> তুই থামবি? আমি ডিভোর্স নিয়ে ভাবছি। আমার জন্য মেয়েটার ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। শোন আগে ওর জন্য একটা ভালো কাজ খুঁজতে হবে তারপর ডিভোর্স নিয়ে ভাবতে হবে। এখানে ওকে রাখা জাবেনা।
> পাগল হয়েছিস রাতে বিয়ে হলো আর এখন ডিভোর্স নিয়ে ভাবছিস। কিছুদিন পার হোক তারপর না হয় ভাবিস।
> তোকে ভাবতে হবে না। দ্রুত ফ্রেস হয়ে আই আমি অপেক্ষা করছি।
তমাল কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে বাথরুমে চলে গেলো। রাত্রী নিচে সবার জন্য নাস্তা তৈরী করেছে। এর মধ্যেই সকালবেলায় রবি বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে। গতকালের কাহিনি শুনে ও বারবার ঘুরে ঘুরে রাত্রীকে দেখছে। রাত্রি ওর সঙ্গে মেশার চেষ্টা করছে বিভিন্ন কথাবার্তা বলে ফ্রি হতে চেয়েছে কিন্তু ও কোনো অজানা কারণে চুপ করে আছে। রাত্রী শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যেই আরাভ তমালকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ক্লাসের ঝামেলা শেষ করে রাত্রীর জন্য কাজের সন্ধান করতে হবে। ও আজ থেকে নিয়ম করে কাজটা চালিয়ে যাবে। চেনাজানা ভালো পরিবারের খোঁজ করবে। যেখানে থাকতে ওর অসুবিধা যাতে না হয়। এই শহরে কাজের মেয়েদের কাজে অভাব নেই কিন্তু ভালো মানুষের অনেক অভাব আছে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ওরা ক্লাসে চলে আসলো।। দুইটা ক্লাসের শেষে বিরতির সময় তমাল ওর কানে কানে ফিসফিস করে বল‍ল,
> ক‍্য‍ান্টিনে যাবি? যদি সে আসে?
> ইচ্ছে নেই ওসবে নজর দেবার। আমি ডিভোর্স ছাড়া কারো সঙ্গে কোনো সম্পর্কে জড়াতে পারবো না।
> তোর যা ইচ্ছে।
তমাল ওকে আর জোর করলো না। সময় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তমাল ওকে বসতে বলে বাথরুমের চলে গেলো ঠিক তখনই একটা ছেলে এসে জিঙ্গাসা করলো,
> আপনি আরাভ হোসাইন?
> জ্বী।
> আপনার একটা চিঠি আছে। নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন একটা মেয়ে আপনাকে চিঠিটা দিতে বলেছিল।
ছেলেটা কথা শেষ করে ওর দিকে একটা হলুদ খাম এগিয়ে দিলো। আরাভ ভ্রু কুচকে চিঠিটা হাত বাড়িয়ে নিতেই ছেলেটা চলে গেলো। ও কৌতূহলী হয়ে চিঠির খুললো। হলুদ কাগজে লাল কালিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে,
“মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হতে না পারলে সম্পর্কের বন্ধনের কি প্রয়োজন?”
দুই লাইন লেখাটা পড়ে ও কিছুই বুঝতে পারলো না।খাম বা চিঠির উপরে নিচে কিছুই লেখা নেই। তমাল বাথরুম থেকে ফিরে এসে ওকে কাগজ হাতে বসতে দেখে জিঞ্জাসা করলো। আরাভ কথা না বলে চিঠিটা ওর দিকে এগিয়ে দিলো। দুজনেই চুপচাপ। আরাভের এমন কোনো মেয়ের সঙ্গে পরিচয় নেই যে মুখে না বলে চিঠিতে বলবে। তাছাড়া বিয়ের বিষয়ে কাউকে বলেনি। বন্ধু বান্ধবী বলতে তমাল ছাড়া কারো সঙ্গে তেমন ভালো সম্পর্ক ও নেই। যারা আছে তাদের সঙ্গে এতোটা খাতির হয়ে উঠেনি। আরাভ চিঠিটা পকেটে নিয়ে তমালকে নিয়ে ফিঁরে আসলো। পরিচিত দুজন আন্টির সঙ্গে ওর আলাপ হয়েছে রাত্রীর কাজের বিষয়ে কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রাত্রী আর ওর বিষয়ে জানাজনি হলে উনারা সবাইকে জানিয়ে দিবেন। চেনাজানা বাড়িতে কাজের জন্য ওকে রাখা মোটেও নিরাপদ হবে না। এইসেই ভেবে ও বাড়িতে ফিরে আসলো। বাড়িতে সকালের মতোই পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। ও চুপচাপ নিজের রুমে গিয়ে গা এলিয়ে দিলো। খোলা জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাত্রী। মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা করছে। কিছুক্ষণ আগে ঠান্ডা চা পরিবেশনের অপরাধে ওর কপালে চায়ের কাপ দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। কিছুটা কেটে গেছে সেখান থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে রক্ত পড়ছে। ও টগবগে গরম পানিতে চা তৈরী করে মীরার ঘরে রেখে এসেছিল কিন্তু মীরা তখন না খেয়ে অনেক্ষণ পরে খেতে গিয়ে ঠান্ডা পেয়েছে। ওর উপরে দোষারোপ করে চায়ের কাপটা ওর দিকে ছুড়ে দিয়েছিল। কাপটা রাত্রীর কপালে আঘাত করে মাটিতে পড়ে ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। ও কপাল ধরে অনেকক্ষণ বসে ছিল কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।কাটা কপাল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে ওর থুতনি দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে। সোনিয়া মির্জা দেখেও না দেখার ভান করে রবিকে দিয়ে মীরার জন্য নতুন চা তৈরী করিয়ে নিয়েছেন। রাত্রী অনেক্ষণ বসে থেকে তখন কিছুটা কমেছিল তখন নিজের রুমে চলে এসেছে। বাবা মা থাকলে এমন পরিস্থিতি কিছুতেই হতো না। নিজের মন্দ ভাগ‍্যের কথা চিন্তা করে ওর চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। বাবা মা থাকলে স্বর্গরাজ্যের রাজনকুমারীর মতো মানুষ হতে পারতো কিন্তু কপালের দোষে দুঃখগাথার রাজক‍ন‍্যা হয়ে গেছে।। হঠাৎ দরজা ধাক্কানোর শব্দে ওর ধ‍্যান ভাঙলো। আরভ বাইরে দাড়িয়ে আছে। রাত্রী তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিয়ে আচলে থাকা কালির কোটা বের করে কোনোমতে মুখে একটু খানি লাগিয়ে দরজা খুলে দিলো। আরাভ সোজা ওর চোখের দিকে তাঁকিয়ে আছে। রাত্রীর কালো মুখে কপালের লাল রক্তটা ফুটে আছে। চোখের পাপড়িতে পানির ফোয়ারা। আরাভ আনমনে নিজের হাতটা ওর কপালে রাখতে গেলো কিন্তু রাত্রী সঙ্গে সঙ্গে পেছনে ঘুরে ফেলল। ওর মুখে হাত রাখলে ভয়ানক বিপদ হবে। আরাভ সব জেনে যাবে তখন কি হবে?

চলবে

ভুলত্রুটি মার্জনা করবেন।

আসুন নামাজ ও কোরআন পড়ি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here