#উরন্ত_ভালোবাসা
#পর্ব_২
#কলমে_অপরাজিতা_ইসলাম
প্রজ্ঞা আর রুদ্ধ দু’জনেই গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে।আর ওদের সামনে মিস্টার ফারাবী আহমেদ আর মিস্টার আরিয়ান হাসান অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।বাকি সবাই নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।একটু বাদেই প্রজ্ঞার বাবা মিস্টার ফারাবী আহমেদ বললেন,
“কাজি সাহেব বিয়ের সকল কাজ শুরু করুন।”
এই কথা শুনেই রুদ্ধ আর প্রজ্ঞা একই সাথে চিৎকার করে বলল,
“নাআআআআআ”
ওরা আর কিছু বলবে,তার আগেই সবার রাগী দৃষ্টি দেখে চুপ করে গেল।
মিস্টার আরিয়ান হাসান গম্ভীর গলায় বললেন,
“যা সিনক্রিয়েট করার সেটা ইতোমধ্যেই করে ফেলেছো।তাই এখন আর একটা টু শব্দ ও উচ্চারণ করবে না তোমরা বুঝেছো।”
প্রজ্ঞার মা মিসেস অনিমা আহমেদ আর রুদ্ধর মা মিসেস মারিয়া হাসান এসে ওদের দু’জনকে স্টেজে এসে বসিয়ে দিল।প্রজ্ঞা হাঁটতেই পারছে না।তবুও অনেক কষ্টে স্টেজে গিয়ে বসলো রুদ্ধর পাশে।কাজি সাহেব বিয়ের কাজ শুরু করলেন।কবুল বলার সময় রুদ্ধ আর প্রজ্ঞা দু’জনই গম্ভীর কন্ঠে কবুল বলেছে।বিয়ে পড়ানো সম্পূর্ণ হলে সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো।প্রজ্ঞা রাগে ফোঁস ফোঁস করছে।রুদ্ধ গম্ভীর মুখে মাথা নিচু করে আছে।একটু পর বিদায়ের সময় প্রজ্ঞা হঠাৎই চিল্লিয়ে কেঁদে উঠলো।কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
“তোমরা সবাই পঁচা।আমাকে বিদায় করার এতই যখন তাড়া ছিল তাহলে আমাকে বলতে পারতে।আমি নিজেই চলে যেতাম।”
প্রজ্ঞার মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে কাছে টেনে বলল,
“আরে পাগলী মেয়ে আমার কাঁদছিস কেন?মেয়ে হয়ে জন্মালে প্রত্যেককেই শশুর বাড়িতে যেতে হয়।এটাই নিয়ম মা।”
“আর তাছাড়া তুই কি অন্য কোথাও যাচ্ছিস নাকি?তুই তো আমাদের বাসাতেই যাচ্ছিস।তোর আরেকটা বাসায় যাচ্ছিস তুই।”
মিসেস মারিয়া হাসানের কথায় প্রজ্ঞা ওর মাকে ছেড়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“মামনি সবই তো ঠিক আছে।কিন্তু তোমার এই খচ্চর পোলার সাথে আমি থাকবো কিভাবে বলো তো?”
প্রজ্ঞার কথার প্রত্যুত্তরে রুদ্ধ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আর তুই কি হ্যা?শাঁকচুন্নি একটা।”
“এই চুপ ভাল্লুক কোথাকার।”
“এই দেখ…”
“এই চুপ সবাই।আবার লেগে গেলি কেন তোরা হ্যা?আর কিসের তুই?তোরা দু’জন এখন বর-বউ।তাই তুমি করে ডাকবি একে-অপরকে।”
মিসেস অনিমা আহমেদের কথায় দু’জনেই চিল্লিয়ে বলল,
“অসম্ভব।”
“আমি এই শাঁকচুন্নিকে তুমি করে বলতে পারবো না।”
“আমিও এই ভাল্লুক ব্যাটাকে তুমি করে বলতে পারবো না।”
ওদের দু’জনের ঝগড়ার মাঝেই রুদ্ধ আর প্রজ্ঞার বাবা এসে বললেন,
“তোমাদের যা ইচ্ছা করো।আগের মতোই থাকো।তাতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।কিন্তু মানুষজনের সামনে একটু ভদ্র হয়ে থেকো।তাহলেই হবে।”
রুদ্ধ আর প্রজ্ঞা কিছু একটা ভেবে বলল,
“ওকে”
“এখন চলো অনেক রাত হয়েছে।আমাদের এখন রওনা দিতে হবে।”
প্রজ্ঞা যাওয়ার কথা শুনে নাক টেনে বলল,
“আমার সাথে প্রেমা ও যাক।আমি যখন আবার আসবো তখন আসবেনি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে এখন চলো সবাই।”
মিস্টার আরিয়ান হাসানের কথায় সবাই যাওয়ার জন্য অগ্রসর হলেই প্রজ্ঞা বলে উঠল,
“আমি তো হাঁটতে পারবো না।পায়ে অনেক ব্যাথা আমার।”
“কেন কি হয়েছে তোর পায়ে?”
“কি আর হবে ভাইয়া বলো।শাঁকচুন্নি বেশি লাফালে পড়ে তো যাবেই।রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল।”
রুদ্ধর কথায় প্রজ্ঞা দাঁত কটমট করে তাকালো ওর দিকে।
রোহান আবারো বলল,
“এখন কি করবি?”
“কি আর করার।আমার আবারো এই পেত্নিকে কোলে নিতে হবে।”
এটা বলেই রুদ্ধ প্রজ্ঞাকে কোলে তুলে নিল।সবাই মুচকি হেসে গাড়িতে উঠল।গন্তব্য রুদ্ধদের বাসা।প্রজ্ঞাদের বাসা থেকে মাত্র ত্রিশ মিনিটের দুরত্বেই রুদ্ধদের বাসা।প্রেমা আর রোহান পাশাপাশি বসে আছে।কারো মুখেই কোনো কথা নেই।রোহান প্রেমার দিকে তাকাতেই ওদের দু’জনের চোখাচোখি হয়ে গেল।দু’জনেই অপ্রস্তুত হয়ে চোখ ঘুড়িয়ে নিল।প্রেমা লাজুক হেসে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো।রোহান কিছু না বলে মুচকি হেসে ফোনে স্ক্রোল করতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পর ওরা সবাই এসে নামলো “ফ্লাওয়ার হ্যাভেন” এর সামনে।এই নামটা রুদ্ধ আর প্রজ্ঞা দু’জন মিলেই দিয়েছে ওদের বাসার।ছোট থেকেই একসাথে বড় হয়েছে ওরা।তবে ওদের বন্ধুত্বটা অন্য রকম।সব সময় ঝগড়া নিয়েই পড়ে থাকে দু’জন।একই ভার্সিটিতে পড়ার সুবাদে সেখানেও সবাই এই দু’জন বিখ্যাত ঝগড়ুটের সম্পর্কে বেশ ভালো করেই জানে।
সবাই বাসার ভেতরে গিয়ে হল রুমে বসলো।একটু মিষ্টি,পানি খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে রুদ্ধ আর প্রজ্ঞার কাজিন,বন্ধুরা মিলে প্রজ্ঞাকে রুদ্ধর রুমে গিয়ে রেখে আসল।
প্রজ্ঞা চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো রুমের সব লাইট বন্ধ।তবুও পুরো রুম আলোকিত হয়ে আছে বিভিন্ন রকমের রং-বেরঙের মোমের আলোয়।লাল আর সাদা গোলাপের সুগন্ধ পুরো রুম জুড়ে ছড়িয়ে পরেছে।বিছানার দুইপাশে টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে।তার পাশেই ফুল দানিতে তাজা তাজা ফুল সাজিয়ে রাখা হয়েছে।আর পুরো বিছানা জুড়ে লাল গোলাপের পাপড়ির ছড়াছড়ি।অনেক সুন্দর ডেকোরেশন করা হয়েছে।প্রজ্ঞা এসব দেখে ওয়াশরুমে চলে গেল।
_______________________________
রাত প্রায় একটার দিকে রুদ্ধ রুমে এসে যা দেখলো তাতে ওও হাসবে নাকি কাঁদবে সেটাই বুঝতে পারছে না।ভাগ্য করে একটা বউ পেয়েছে।যার সব কিছুই অন্য রকম।অন্য সব মেয়েদের যেমন লম্বা চুল পছন্দ প্রজ্ঞার চুলও তেমন।কিন্তু সে তার চুলের কোনোই যত্ন করে না।তবুও ওর চুলগুলো মাশাআল্লাহ।আর সেই চুলগুলোরই অপব্যবহার করছে এই মেয়ে।
রুদ্ধ রুমে ঢুকে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিয়ে প্রজ্ঞার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঐ শাঁকচুন্নি এসব কি হ্যা?”
প্রজ্ঞা ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলো সব ঠিকই আছে।তারপর ভ্রু নাচিয়ে রুদ্ধর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো,
“কেমন লাগছে আমাকে?”
“ফাজলামি করিস?”
“আরে এখানে ফাজলামির কি হলো হ্যা?”
“তুই এমন সারা শরীরে সবুজ রং আর ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়ে চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে এমন শাড়ি পড়েছিস কেন হ্যা?”
“আরেহ বর সাহেব আপনার ইচ্ছে পূরণ করলাম।”
“মানে?”
“মানে আর কি?তুই তো আমাকে সব সময় শাঁকচুন্নি বলিস।তাই ভাবলাম এমন একটা রাতে তোর মনের মতো করেই সাজি আমি।”
প্রজ্ঞার কথায় রুদ্ধর মাথায় যেন দাও দাও করে আগুন জ্বলছে।এমন অদ্ভুত মেয়ে আর একটাও দেখেনি ওও।যেখানে বাসর রাতে সবাই লাল টুকটুকে বউ সেজে থাকে,সেখানে ওর বউ কিনা সত্যিকারের শাঁকচুন্নি সেজে বসে আছে।রাগে নিজের মাথার চুল নিজেরই ছিঁড়তে মন চাচ্ছে রুদ্ধর।
“কি হলো এমনভাবে দাড়িয়ে আছিস কেন?”
“আসলে অতি সুখের ঠ্যালায় আমি পাথর হয়ে গেছি।”
এটা বলেই রুদ্ধ একটা মেকি হাসি দিল।প্রজ্ঞা রুদ্ধকে আর একটু জ্বালানোর জন্য বলল,
“ওও আমার প্রাণের স্বামী এই নাও দুধ খাও।”
রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“দুধ?দুধ কেন খাবো?”
“ওরে কচি খোকা,এই তুই জানিস না?বাসর রাতে দুধ খেতে হয়।ঢং করিস আমার সাথে?”
“হ্যা আমি তো এখন বাচ্চাদের মতো দুধ-ই খাবো।আর কিছু তো করার নাই আমার যত্তসব।”
এটা বলেই রুদ্ধ দুধের গ্লাস টা প্রজ্ঞার থেকে নিয়ে ঠাস করে টি-টেবিলের উপরে রেখে ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়লো।প্রজ্ঞা একটানে রুদ্ধকে খাট থেকে নামিয়ে বলল,
“ঐ ভাল্লুক,তুই এমন করে শুয়ে পড়লি ক্যান?”
“তো কি করবো হ্যা?”
“পুরো খাট জুড়ে তুই শুইলে আমি কোথায় থাকবো?দেখ নাটক,সিনেমার মতো ভাবিস না যে আমি সোফা বা নিচে শুয়ে পরবো।আর তোর রুমে এমনিতেও সোফা নাই।সো আমি এখন খাটেই থাকবো।”
“তো থাক নারে ভাই।কে মানা করছে?ঐ পাশে গিয়ে শুয়ে পড়।এখন আমাকে ঘুমাতে দে।গুড নাইট।”
“এহহহহহ কিসের গুড নাইট?তুই ঘুমাবি তো ঘুমা।আমার কোনো সমস্যা নাই।কিন্তু কোলবালিশ টা আমাকে দে তাহলেই হবে।”
“এই ওয়েট ওয়েট!”
“কি হয়ছে?”
“মামা বাড়ির আবদার নাকি?এটা আমার কোলবালিশ।আর আমি কোলবালিশ ছাড়া ঘুমাতে পারিনা।”
“আমিও তো কোলবালিশ ছাড়া থাকতে পারি না।”
“এখন কি করবি তাহলে?কোলবালিশ তো একটাই।”
প্রজ্ঞা কিছু একটা ভেবে বলল,
“তোর কোলবালিশ লাগবে তাইনা?”
রুদ্ধ কোনো কিছু না বুঝেই বলল,
“হ্যা”
এরপর প্রজ্ঞা যা করলো সেটা রুদ্ধর ভাবনারও বাইরে ছিল।
চলবে?